বাংলাস্ফিয়ার: পুজোর আগে কলকাতার রাস্তা ও উড়ালপুল রামধনুর রঙে সাজানোর উদ্যোগ ঘিরে এবার নিরাপত্তার প্রশ্ন। সদ্য রং করা রাস্তায় মোটরবাইক পিছলে পড়ার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পরে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য সরকার। বুধবার পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল জানান, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আধিকারিকদের ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে এবং দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করতে বলেছেন।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয়কুমার নন্দকেও বিষয়টি পরীক্ষা করতে বলা হয়েছে। বৃষ্টির পরে রঙিন রাস্তার উপর বাইকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে রং ব্যবহারের সঙ্গে দুর্ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাচ্ছে না। মন্ত্রীও জানিয়েছেন, ঘটনার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি পরীক্ষা করা হচ্ছে।
সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি একটি গাড়ির ড্যাশক্যামের ফুটেজ বলে মনে হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে রামধনুর রঙে সাজানো চিংড়িঘাটা উড়ালপুলে তিন জন বাইকচালককে পিছলে পড়তে দেখা যাচ্ছে। তবে সংবাদপত্রটি ভিডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। ফলে ফুটেজ ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হলেও তার ভিত্তিতে দুর্ঘটনার কারণ চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
অগ্নিমিত্রা অবশ্য রাস্তায় সাধারণ চকচকে রং ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, পিছলে যাওয়া আটকাতে বিশেষ ধরনের ‘অ্যান্টি-স্কিড’ রং ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি জানান, এই রং স্থায়ী নয়; দুর্গাপুজো উপলক্ষেই রাস্তা সাজানো হয়েছে। আলপনা আঁকার সঙ্গে বাংলার ঐতিহ্যের সম্পর্ক রয়েছে বলেও যুক্তি দেন মন্ত্রী। গাড়ি চালানোর সময় রঙের কারণে চোখে অসুবিধা হলে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম দুর্গাপুজো উপলক্ষে শহরের বিভিন্ন অংশে এই সৌন্দর্যায়ন চলছে। গড়িয়াহাট ও চিংড়িঘাটা উড়ালপুল এবং রেড রোডের একাংশে উজ্জ্বল রং দেওয়া হয়েছে। পার্ক সার্কাসের সাতমাথার মোড়ের কাছে ও গড়িয়াহাট এলাকায় আঁকা হয়েছে আলপনা। সরকারের বক্তব্য, শহরের ঐতিহ্য, সম্প্রীতি এবং মিলনের ভাবনা তুলে ধরতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই কাজের অর্থের উৎস নিয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছেন অগ্নিমিত্রা। তাঁর বক্তব্য, রাস্তা রাঙাতে সরকারি অর্থ খরচ হয়নি; সংশ্লিষ্ট সংস্থার সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর তহবিল থেকে খরচ বহন করা হয়েছে। শহর সাজানোর জন্য রং প্রস্তুতকারী সংস্থাকে অনুরোধ করা হয়েছিল বলে জানান তিনি। অর্থের উৎস নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগের জবাবেই মন্ত্রী এই ব্যাখ্যা দেন।
অন্যদিকে, প্রদেশ কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক আশুতোষ চট্টোপাধ্যায় অগ্নিমিত্রা এবং কলকাতা পুরসভার কমিশনার ও প্রশাসক স্মিতা পাণ্ডেকে চিঠি দিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, যানবাহন চলাচলের রাস্তার সম্পূর্ণ চাকার গতিপথ সাধারণ গৃহস্থালির রং দিয়ে ঢেকে দেওয়া উচিত নয়। চকচকে প্রলেপে রাস্তা মসৃণ হয়ে গেলে বৃষ্টি, তেল বা ডিজেলের সংস্পর্শে চাকার সঙ্গে রাস্তার ঘর্ষণ কমে পিছলে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়তে পারে।
পরিবেশবিদ ও প্রযুক্তিবিদ সোমেন্দ্রমোহন ঘোষও রাস্তার উপযোগী বিশেষ রঙের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর আশঙ্কা, সাধারণ রং ব্যবহৃত হয়ে থাকলে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। তাঁর বক্তব্য, রাস্তার গর্ত রঙের আড়ালে ঢাকা পড়লেও চালকদের বিপদ বাড়তে পারে; সৌন্দর্যায়নের পরিকল্পনায় তাই চলাচলের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে বলে মনে করেন তিনি। সিপিএম নেতা পার্থপ্রতিম বিশ্বাসও এই উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল শিবিরের অভিযোগ, প্রথম বৃষ্টিতেই রঙিন উড়ালপুল বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। তারা মন্ত্রীর জবাবদিহি দাবি করেছে।
এখন তদন্তে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন, ঠিক কোন উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট জায়গায় বাইক পিছলে যাওয়ার প্রকৃত কারণ কী। মন্ত্রীর নিরাপদ রং ব্যবহারের দাবি এবং বিরোধীদের বিপদের অভিযোগের মধ্যে এই পরীক্ষার ফলই গুরুত্বপূর্ণ। আপাতত প্রশাসন কারণ অনুসন্ধানের কথা জানিয়েছে; রঙের ত্রুটি প্রমাণিত হয়েছে, এমন কোনও সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।