বাংলাস্ফিয়ার: দুর্গাপুজোয় সিপিএমের বইয়ের স্টল বসানো নিয়ে মামলায় বিরোধীদের কণ্ঠরোধ না করার বার্তা দিল কলকাতা হাই কোর্ট। বুধবার, ১৪ অক্টোবর বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য জানান, অন্য রাজনৈতিক দলের বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ বন্ধ করা গণতন্ত্রের ভাবনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁয় যশোর রোডের পাশে প্রস্তাবিত বইয়ের স্টল ঘিরে এই মামলা। সেখানে অন্য সংগঠন স্টল বসাতে পারলে সিপিএম কেন বঞ্চিত হবে, সেই প্রশ্ন তুলেছে আদালত।
মামলাকারীদের দাবি, বহু দশক ধরে ওই এলাকায় দুর্গাপুজোর সময় দলের অস্থায়ী বইয়ের স্টল বসে। এ বছর হিন্দু জাগরণ মঞ্চের বাধায় সেই আয়োজন আটকে যায়। সংশ্লিষ্ট জায়গায় সংগঠনটি নিজের কাঠামো তৈরি করেছে বলেও অভিযোগ। তবে এই অভিযোগগুলির সত্যতা নিয়ে আদালত এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি। বিতর্কিত জায়গা ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রশাসন সব পক্ষের সঙ্গে সমান আচরণ করেছে কি না, শুনানিতে মূলত সেই প্রশ্নই উঠে এসেছে।
সিপিএমের আইনজীবী শামিম আহমেদ আদালতে জানান, বইয়ের স্টল তৈরির বিষয়ে পুলিশ ও মহকুমাশাসককে আগেই জানানো হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, ১ অক্টোবর বাঁশের অস্থায়ী কাঠামো তৈরির সময় হিন্দু জাগরণ মঞ্চের সদস্য বলে পরিচিত কয়েকজন তাঁদের সরিয়ে দেন। পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। সংশ্লিষ্ট জায়গার পিছনেই সিপিএমের দলীয় কার্যালয় রয়েছে বলেও আদালতে জানানো হয়।
রাজ্যের তরফে পাল্টা যুক্তি দেওয়া হয়, প্রস্তাবিত স্টলের জায়গাটি পূর্ত দফতরের অধীন। ফলে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি প্রয়োজন। পুলিশকে শুধু আয়োজনের কথা জানিয়ে দিলেই সেই অনুমতি পাওয়া হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না। রাজ্য মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। তাদের বক্তব্য, সরকারি জমি ব্যবহারের অনুমতিসংক্রান্ত বিরোধকে সরাসরি পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার মামলা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। দু’পক্ষই এফআইআর করেছে বলেও জানানো হয়।
বিচারপতি অবশ্য জানতে চান, একই রাস্তায় অন্য সংগঠনের কাঠামো তৈরি হলে প্রশাসন কীভাবে তা অনুমোদন করছে। অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন অস্বীকার না করেও তিনি সব পক্ষের ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রয়োগের কথা বলেন। আবেদনকারীদের কাঠামো সরানো হয়ে থাকলে অথবা তাঁদের স্টল তৈরিতে বাধা দেওয়া হলে পুলিশের ভূমিকা থাকবেই বলে আদালত জানায়। বইয়ের দোকান করতে চাওয়ার জন্য এমন বাধার মুখে পড়তে হবে কেন, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
শুনানিতে অ্যাডভোকেট জেনারেল সুরজিৎনাথ মিত্র জানান, কারও কণ্ঠরোধের চেষ্টা হচ্ছে না। বিচারপতির প্রতিক্রিয়া ছিল, পরিস্থিতি দেখে তেমনটাই মনে হচ্ছে। উত্তর কলকাতায় পুজোর সময় প্রধান রাস্তাগুলিতে অসংখ্য স্টল বসার প্রসঙ্গও তোলেন তিনি। সেগুলির অনুমতি কীভাবে দেওয়া হয়, তা জানতে চায় আদালত। বেছে বেছে কাউকে ছাড় দেওয়া এবং কাউকে আটকে দেওয়ার নীতি চলতে পারে না বলেও পর্যবেক্ষণ করে বেঞ্চ।
বনগাঁ থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ আধিকারিককে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট। যশোর রোডে পূর্ত দফতর বা অন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া আর কোনও স্টল তৈরি হয়েছে কি না, তা জানাতে হবে। পাশাপাশি সিপিএমকে অতিরিক্ত হলফনামা দিয়ে প্রাসঙ্গিক তথ্য ও নথি পেশের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর আবার মামলাটি শোনার কথা।
এই পর্যায়ে আদালতের অবস্থান তাই অনুমতির প্রয়োজন বাতিল করার নয়; অনুমতির বিধি যেন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয়, সেটিই বিচার্য। দীর্ঘদিন স্টল বসানোর দাবি একদিকে, সরকারি জায়গা ব্যবহারের বিধি অন্যদিকে—দুই বিষয়ই আলোচনায় রয়েছে। সেই সঙ্গে উঠেছে বিরোধী দলের রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ। পুলিশের রিপোর্ট ও অতিরিক্ত হলফনামা বিবেচনার আগে স্টল বসানোর চূড়ান্ত ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে বলে এই শুনানিকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। আপাতত আদালত ঘটনাস্থলের প্রকৃত পরিস্থিতি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তি জানতে চেয়েছে। পরবর্তী শুনানিতে সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।