বাংলাস্ফিয়ারঃ সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনে আবেদন ও শংসাপত্র পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজ করার আশ্বাস দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁয় দুর্গাপুজোর উদ্বোধনে গিয়ে তিনি জানান, জেলাশাসকের দপ্তর থেকেই সিএএ-র শংসাপত্র পাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। মতুয়া সম্প্রদায়ের কাউকে নাগরিকত্বের সুযোগ থেকে বাদ দেওয়া হবে না বলেও প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
বনগাঁর গান্ধীপল্লি বিবেকানন্দ স্পোর্টিং ক্লাবের পুজোর মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “কথা দিচ্ছি, কোনও মতুয়া বাদ যাবেন না।” সিএএ নিয়ে জটিলতা দূর করার কথা জানিয়ে উপস্থিত মানুষকে আশ্বস্ত করেন তিনি। এই পুজোর আয়োজনে রয়েছেন বনগাঁ উত্তরের বিধায়ক তথা রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়া।
বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বনগাঁ এবং সংলগ্ন এলাকায় বহু মতুয়া পরিবারের বসবাস। নাগরিকত্বের স্বীকৃতি তাঁদের দীর্ঘদিনের দাবি। ফলে এই অঞ্চলে নাগরিকত্ব, সীমান্তের নিরাপত্তা এবং অনুপ্রবেশের প্রশ্ন বারবার রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। সেই পটভূমিতে পুজোর অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রীর এই আশ্বাস বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
শুভেন্দুর দাবি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এখন রাজ্যকে এই শংসাপত্র দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সিএএ-তে নাম নথিভুক্ত করা কিংবা শংসাপত্র সংগ্রহে আবেদনকারীদের সমস্যায় পড়তে হবে না। নাগরিকত্ব পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলির কাছে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করার বার্তাই তুলে ধরেন তিনি। সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও পুনরায় জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
তবে মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক আশ্বাসের পাশাপাশি আইনের নির্দিষ্ট যোগ্যতার শর্তগুলিও প্রাসঙ্গিক। কেন্দ্রের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত সরকারি পোর্টাল অনুযায়ী, সিএএ-র বিশেষ ব্যবস্থায় বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের যোগ্য ব্যক্তিরা আবেদন করতে পারেন। তাঁদের ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর বা তার আগে ভারতে প্রবেশের শর্ত পূরণ করতে হয়। পাসপোর্ট ও বিদেশি সংক্রান্ত আইনের প্রযোজ্য ছাড়ের বিষয়টিও যোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত।
সরকারি নির্দেশিকায় জেলা স্তরের কমিটির মাধ্যমে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কমিটির কাছে অনলাইনে আবেদন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। আবেদনকারীর নিজস্ব ইমেল এবং মোবাইল নম্বর প্রয়োজন। তাই জেলাশাসকের দপ্তর থেকে শংসাপত্র দেওয়ার ঘোষণার সঙ্গে আবেদন যাচাই ও নাগরিকত্ব মঞ্জুর করার বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়ার সম্পর্ক স্পষ্ট হওয়া জরুরি। কেবল সম্প্রদায়গত পরিচয় থাকলেই প্রত্যেকের নাগরিকত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে মঞ্জুর হয়ে যায়, সরকারি নির্দেশিকা এমন কথা বলছে না।
একই মঞ্চ থেকে সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ নিয়েও কড়া বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী। বাংলাদেশ থেকে এসে কেউ বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করলে তা বরদাস্ত করা হবে না বলে জানান তিনি। পুলিশ ও প্রশাসন সতর্ক রয়েছে বলেও দাবি করেন শুভেন্দু।
নাগরিকত্বের পাশাপাশি স্থানীয় উন্নয়ন এবং সরকারি প্রকল্পের কথাও ওঠে তাঁর বক্তৃতায়। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, বনগাঁ এলাকায় ৭২ হাজার মহিলা অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পে তিন হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। আরও কেউ যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও সুবিধা না পেয়ে থাকলে তাঁকে আবেদন করার কথা বলেন তিনি। সেই আবেদন খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানান। সীমান্তবর্তী বনগাঁয় শিল্প স্থাপনের প্রয়োজনের কথাও উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী।
বক্তৃতায় বিরোধী আন্দোলনকারীদেরও আক্রমণ করেন শুভেন্দু। ‘আরশোলা’, ‘ছারপোকা’ এবং নকশালদের থেকে সতর্ক থাকার কথা বলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, এই শক্তিগুলি দেশকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ, পুজো উদ্বোধনের অনুষ্ঠানেও নাগরিকত্বের আশ্বাস, সরকারি প্রকল্পের প্রচার এবং বিরোধীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণ পাশাপাশি জায়গা পেয়েছে।
সব মিলিয়ে মঙ্গলবার বনগাঁর পুজো উদ্বোধনের মঞ্চ থেকে মতুয়াদের আশ্বস্ত করার পাশাপাশি নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বার্তা দিলেন শুভেন্দু। তবে আবেদন সহজ করার অর্থ কোন নথির প্রয়োজন কমবে, কোথায় কী সহায়তা মিলবে কিংবা শংসাপত্র পেতে কত দিন লাগবে—এই ব্যবহারিক প্রশ্নগুলির উত্তরই আবেদনকারীদের কাছে সবচেয়ে জরুরি। ঘোষণার বাস্তব ফল নির্ভর করবে সেই প্রশাসনিক ব্যবস্থা কতটা স্পষ্ট এবং সহজলভ্য হয়, তার উপর।