বাংলাস্ফিয়ার: বিজেপি নেতৃত্বের কাজকর্মের ধরন নিয়ে সাম্প্রতিক কালে আরএসএসের যতই আপত্তি থাকুক, সাম্প্রতিক বিক্ষোভ সম্পর্কে দলের ভাবনার সঙ্গে সংঘের অবস্থান যে মিলে যাচ্ছে, মোহন ভাগবতের কথায় তা স্পষ্ট। এই বিক্ষোভের নেতৃত্বে ছিল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং বিরোধীরা, বিশেষত কংগ্রেস। রাহুল গান্ধী আরও এগিয়ে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ভাগবত এবং অজিত ডোভালকে নিশানা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান ব্যবস্থাটি চালাচ্ছেন এই ব্যক্তিরাই। প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন তিনি। বিজেপি এবং আরএসএসকে ‘ধ্বংস’ করার শপথও নিয়েছেন—শুধু তাদের জায়গায় অন্য কাউকে প্রতিষ্ঠার কথা বলেননি।
যাঁরা আরএসএস প্রধানকে চেনেন, তাঁদের বক্তব্য, তিনি সংঘের মতামতই প্রকাশ করেন; তাৎক্ষণিক আবেগে কিছু বলে ফেলা তাঁর স্বভাব নয়। আরএসএসের সর্বশেষ অবস্থান দেখাচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতে নিজের হাতে গড়ে তোলা বিজেপির সঙ্গে একই অবস্থানে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংঘ।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় বিজেপি ও আরএসএসের সম্পর্কে টানাপড়েন দেখা দিয়েছিল। বিজেপি যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার নীচে, ২৪০টি আসনে আটকে গিয়েছিল, তার কারণ হিসেবে অনেকেই মনে করেন, আরএসএস আগের মতো জোরকদমে দলের হয়ে প্রচারে নামেনি। বিজেপির আরএসএসের হাত ধরে চলার আর প্রয়োজন নেই—দলের সভাপতি জে পি নড্ডার এই মন্তব্য সম্পর্ককে আরও জটিল করে তোলে। কারণ, নড্ডা নিজের সিদ্ধান্তেই এমন কথা বলেছেন, এই ব্যাখ্যা খুব কম মানুষই বিশ্বাস করেছিলেন। ২০২৪ সালের বিজয়াদশমীর ভাষণে ভাগবত হিন্দু ঐক্য, বাংলাদেশে হিন্দুদের দুর্দশা এবং নারীদের নিরাপত্তার কথা বলেছিলেন। আক্রমণ করেছিলেন ‘সাংস্কৃতিক মার্ক্সবাদ’-কেও।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, মঙ্গলবারের ভাষণে বিজেপিকে পুরোপুরি ছাড় দিয়েছেন ভাগবত। তিনি বলেছেন, কখনও কখনও রাজনীতিকদের উপর থেকে মানুষের আস্থা চলে যায়। তবে এক দলের রাজনীতিকদের সঙ্গে অন্য দলের রাজনীতিকদের কোনও ফারাক করেননি তিনি। তাঁর বক্তব্য, তখন সমাজকেই দায়িত্ব নিতে হয়, এবং তার মধ্যে ‘আমরাও’—অর্থাৎ আরএসএসও—পড়ি। ভারতকে ‘বিশ্বগুরু’ করে তোলার প্রসঙ্গও তুলেছেন তিনি। ভাগবত বলেছেন, শারীরিক ও মানসিক ভাবে সুস্থ ‘নয়ি পীঢ়ি’, অর্থাৎ নতুন প্রজন্মের নেতাদেরই ভারতকে বিশ্বগুরু করে তোলার দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে।
এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনকড়কে আরএসএসের আমন্ত্রণ অনেকেরই ভ্রু কুঁচকে দিয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে নাটকীয় ভাবে পদ থেকে সরে যাওয়ার বিষয়ে ধনকড় খুব কম কথাই বলেছেন। তাঁর আকস্মিক পদত্যাগের কারণ নিয়ে কেবল জল্পনাই রয়েছে।
আরএসএস প্রধান দলের অবস্থানকে সমর্থন করায় বিজেপি এখন বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সুর আরও চড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ২০২৬ সালের জুন-জুলাইয়ে সিজেপির যে বিক্ষোভ পরে ‘যন্তর মন্তর–১’ নামে পরিচিত হয়, সেই সময় এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পরে বিক্ষোভকারীদের প্রতি তুলনামূলক নরম অবস্থান নিয়েছিলেন ভাগবত। তিনি বলেছিলেন, প্রশ্নহীন ‘আনুগত্য’-এর যুগ শেষ। জেন জেড বা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছনোর উদ্দেশ্যে মুম্বইয়ের মুকেশ অম্বানী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে প্রায় দু’হাজার তরুণ-তরুণীর সঙ্গে মতবিনিময়ও করেছিলেন তিনি। এখন আরএসএস প্রধানের সন্দেহ, ‘ভারতকে দুর্বল’ করতে চায় এমন শক্তির হাতে বিক্ষোভগুলি হয়তো ‘রাজনীতির হাতিয়ার’ হয়ে উঠেছে।
আগামী বছরের গোড়ায় যে রাজ্যগুলিতে নির্বাচন হবে, সেখানে বিজেপির হয়ে আরএসএসের কর্মীরা এবার সর্বশক্তি দিয়ে প্রচারে নামার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ভাগবতের বিজয়াদশমীর ভাষণের আর একটি পরিণতি হতে পারে এটি। যা জানা যাচ্ছে, তাতে যোগী আদিত্যনাথের ক্ষমতায় ফেরা নিশ্চিত করতে উত্তরপ্রদেশে আরএসএস ইতিমধ্যেই পুরোদমে কাজে নেমে পড়েছে। সংঘের অনেকেই যোগীকে এমন এক নেতা হিসেবে দেখেন, যিনি জাতীয় স্তরে ভূমিকা পালন করতে পারেন এবং আরএসএসের ‘সভ্যতাকেন্দ্রিক কর্মসূচি’কে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন।
বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান বিরোধী দলগুলির উপরও চাপ তৈরি করবে। সবচেয়ে বেশি করে তা তাদের ঐক্যবদ্ধ হতে বাধ্য করবে, কারণ এই লড়াই তাদের কাছে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হয়ে উঠছে।