বাংলাস্ফিয়ারঃ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নিজেদের ছাত্র সংগঠনের জয় দাবি করেছে বিজেপি ও বিজেডি, দু’পক্ষই। ৩৩৭টি কলেজের মধ্যে ১৪১টিতে সভাপতি পদে জিতেছে এবিভিপি, ১২০টিতে বিসিজেডি। অনেকটা পিছিয়ে তৃতীয় স্থানে কংগ্রেসের এনএসইউআই।
ওড়িশার ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিজেপি ও বিজেডি উভয়েই নিজেদের ছাত্র সংগঠনের জয়ের দাবি করেছে। তবে ফলাফলে কোনও একটি সংগঠনের পক্ষে স্পষ্ট রায় মেলেনি। এই নির্বাচন হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক প্রভাব, তরুণ প্রজন্মের মনোভাব এবং সাংগঠনিক শক্তির পরীক্ষা।
রাজ্যের উচ্চশিক্ষা দফতর এখনও দলভিত্তিক ফলাফলের কোনও সামগ্রিক হিসাব প্রকাশ করেনি।
আট বছর পরে প্রথম বার ওড়িশায় ছাত্র সংসদ নির্বাচন হল। রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরেও পেরিয়ে গিয়েছে দু’বছরের বেশি। এই নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলির অভূতপূর্ব সক্রিয়তা দেখা গিয়েছে। শীর্ষ নেতারা প্রস্তুতির তদারকি করেছেন, প্রার্থী চূড়ান্ত করতে সাহায্য করেছেন এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে প্রচারের খরচও জুগিয়েছেন।
ভোট চাইতে গিয়ে প্রার্থীরা তাঁদের বক্তৃতায় দলের প্রধানদের নাম ব্যবহার করেছেন। দলের রঙে পোস্টার-ব্যানার, তারকা প্রচারক, এলাহি খাওয়াদাওয়া এবং এসইউভি গাড়ির মিছিল—সব মিলিয়ে ক্যাম্পাসে মূলধারার রাজনীতির ক্রমবর্ধমান প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিজেপির কাছে বড় পরীক্ষা
বিজেপির কাছে এই নির্বাচনের বিশেষ তাৎপর্য ছিল। ২০২৪ সালের নির্বাচনী ইস্তাহারে দল ছাত্র সংসদ নির্বাচন ফের চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। জেন জেডের সঙ্গে যোগাযোগ আরও মজবুত করার সুযোগ হিসেবে এই ফলাফলের দিকে নজর রেখেছিল বিজেপি। অন্য দিকে, রাজ্যের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়েছিল এবিভিপি।
দেশের রাজনীতিতে তখন এমন একটি ধারণাও আলোচিত হচ্ছিল যে, তরুণ ভোটাররা বিজেপির থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে এবিভিপির ভাল ফল সেই ধারণার মোকাবিলায় সাহায্য করতে পারত। বিশেষত, খবর অনুযায়ী, বিজেপির একাধিক বিধায়ক নেপথ্যে এই নির্বাচনে সক্রিয় ছিলেন এবং প্রার্থীদের আর্থিক সাহায্য দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছিল।
এবিভিপি বিপুল জয় পেলে রাজ্যের রাজনীতিতে নিজেদের আধিপত্য নিয়ে বিজেপির দাবি আরও জোরালো হত। একই সঙ্গে তরুণ ভোটারদের মধ্যে বিজেডির সমর্থনভিত্তিও দুর্বল হতে পারত। বিজেপির অন্দরের এক নেতা বলেন, “২০২৪ সালের জুনে ওড়িশায় বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনে আঞ্চলিক দলটির পরাজয়ের পরে তরুণ ভোটারদের সমর্থন বিজেডির থেকে সরে যাচ্ছে—এমন একটি ছবি তুলে ধরতে এই রায়কে ব্যবহার করতে পারত দল।”
আগের বিজেডি সরকার ছাত্রছাত্রীদের গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিল বলেও অভিযোগ করেছে বিজেপি। শুক্রবার এক্সে মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝি লেখেন, “আগের সরকার নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ রেখেছিল। ছাত্রছাত্রীদের গণতান্ত্রিক ভাবে মত প্রকাশের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিল। সফল ভাবে নির্বাচন আয়োজন করে এবং ক্যাম্পাসে গণতন্ত্রের চেতনা ফিরিয়ে এনে আমাদের সরকার ছাত্রসমাজকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছে।”
শনিবার এক্সে এবিভিপিকে অভিনন্দন জানান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি লেখেন, “ওড়িশার ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিপুল জয়ের জন্য এবিভিপির সমস্ত কার্যকর্তাকে আন্তরিক অভিনন্দন। প্রথমে পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়, তার পরে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, আর এখন ওড়িশার ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের এই জয় স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে: দেশের যুবশক্তি মিথ্যা, বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা ছড়ানো প্রভাবশালী শক্তিগুলির সঙ্গে নয়, দৃঢ় ভাবে ‘সবার আগে দেশ’ আদর্শের পাশে রয়েছে। এই ফল দেশবিরোধী শক্তিগুলির প্রতি কড়া জবাব।”
নবীনের অবস্থান
বিজেডি ক্ষমতায় থাকার সময়ে ক্যাম্পাসে বরাবরই প্রভাবশালী ছিল বিসিজেডি। নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে এ বারও তারা জোরালো লড়াই করেছে। তবে বিজেপি সরকারি যন্ত্র ও পুলিশকে ব্যবহার করে নির্বাচনে প্রভাব খাটিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে আঞ্চলিক দলটি। সভাপতি পদের উল্লেখযোগ্য অংশ এবিভিপি ও বিসিজেডি উভয়েই জেতায় ফলাফলে কোনও পক্ষেরই স্পষ্ট আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
অতীতে ক্যাম্পাসের নির্বাচন নিয়ে খুব কমই মন্তব্য করতেন বিজেডি সভাপতি তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়ক। কিন্তু এ বার ফল ঘোষণার পরে বিজেপি সরকারকে আক্রমণ করেন তিনি। নির্বাচনে প্রভাব খাটাতে অনৈতিক পন্থা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন।
এক্সে একটি পোস্টে পট্টনায়ক বলেন, এই ফলাফলে ওড়িশার জেন জেড, যুবসমাজ ও ছাত্রসমাজের নিষ্ঠা এবং ঐক্যের প্রতিফলন ঘটেছে।
তিনি লেখেন, “অন্যায় ও অনৈতিক উপায়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন জেতার জন্য বিজেপি সরকারের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বিজেডি ও বিসিজেডির যে সমস্ত নেতা দৃঢ় ভাবে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের সকলকে সাধুবাদ জানাই। কলেজের শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে এবং ছাত্রছাত্রীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে আসুন, আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে এগিয়ে চলি।”
ক্যাম্পাসে উত্তেজনা
একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক উত্তেজনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নিজের বিধানসভা কেন্দ্র নয়াগড়ের একটি মহিলা কলেজের বাইরে পুলিশের সঙ্গে বচসায় জড়ান বিজেডির প্রবীণ বিধায়ক অরুণকুমার সাহু। অভিযোগ ছিল, ক্যাম্পাসে বহিরাগতরা ঢুকেছেন। সেই ঘটনার ভিডিয়ো ভাইরাল হয়।
রাজধানীর অন্যতম প্রধান মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় রমাদেবী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও তীব্র নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়। ফল ঘোষণায় দেরির অভিযোগ তুলে ধর্নায় বসেন বিজেডির এক প্রাক্তন মন্ত্রী, ভুবনেশ্বরের মেয়র সুলোচনা দাস, দলের দুই বিধায়ক এবং অন্য নেতারা।
এই দেরিকে ঘিরে হইচই শুরু হয়। এবিভিপি ও বিসিজেডির সমর্থকদের মধ্যে ধস্তাধস্তিও বাধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়। প্রবল উত্তেজনার মধ্যে রাত ২টো ৪০ মিনিটে ফল ঘোষণা করা হয়। সেখানে সব পদেই জয় পায় বিসিজেডি।
রাজ্যের আর এক প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উৎকল বিশ্ববিদ্যালয়ে ফল ঘোষণা হয় রাত প্রায় ২টোয়। ফল ঘোষণায় দেরির প্রতিবাদে তার কয়েক ঘণ্টা আগে জাতীয় সড়ক অবরোধ করেছিলেন এনএসইউআই এবং কংগ্রেসের অন্য নেতারা।
বিজেডির রাজনৈতিক হিসাব
বিজেডি নেতাদের বক্তব্য, ২০২৪ সালের বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনে দলের শোচনীয় পরাজয়ের পরে যাঁরা তার রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, এই ফল তাঁদের জবাব দিয়েছে।
বিজেডি নেতা বিজয় নায়েক বলেন, “শাসক বিজেপি নির্বাচনে প্রভাব খাটাতে সব রকম অনৈতিক উপায় নিয়েছিল। যেখানে এবিভিপির সাংগঠনিক ভিত দুর্বল, সেখানে তারা নির্বাচন পর্যন্ত বাতিল করেছে। এত ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও এই ফল স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে, জেন জেড এবং যুবসমাজের মধ্যে নবীন পট্টনায়কের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। আগামী দিনে এই তরুণ প্রজন্ম ডবল ইঞ্জিন সরকারকে যোগ্য জবাব দেবে।”
নির্বাচন মূলত এবিভিপি ও বিসিজেডির সরাসরি লড়াইয়ে পরিণত হয়েছিল। তাদের সমর্থিত প্রার্থীদের জেতাতে বিজেপি ও বিজেডি, দু’দলই সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। ছাত্রনেতাদের পাশাপাশি প্রবীণ রাজনীতিকদের উপস্থিতিতে বিজয় মিছিলও দেখিয়ে দিয়েছে, এই নির্বাচনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলি কতটা জড়িয়ে পড়েছিল এবং এর ফলকে তারা কতটা গুরুত্ব দিয়েছিল। সামগ্রিক ফলাফলে অনেকটা পিছিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে এনএসইউআই।