বাংলাস্ফিয়ার: মাথার পিছনে পরপর আঘাত। রক্তক্ষরণে শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে, বারবার হারিয়ে যাচ্ছে চেতনা। সেই অবস্থাতেও নিজেকে বলেছিলেন, ‘স্মিত, কিছু করো। এ ভাবে মরতে পারো না।’ ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানে সহকারী পাইলটের হামলার মুখে বেঁচে থাকার মরিয়া লড়াইয়ের কথা এ ভাবেই জানালেন ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর। শনিবার দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, মৃত্যুকে মেনে নেননি; বুঝেছিলেন, বাঁচতে হলে তখনই কিছু করতে হবে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে তেল আভিভগামী এফজেড১০৭৩ উড়ানে ঘটনাটি ঘটে। অভিযোগ, ককপিটে থাকা জরুরি ব্যবহারের কুঠার দিয়ে মচ্ছরকে আক্রমণ করেন ওমানের সহকারী পাইলট হাম্মাম আল-হাম্মামি। গুরুতর আহত অবস্থাতেও ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন মচ্ছর। সেই সুযোগে বিমানের কর্মী ও যাত্রীরা এগিয়ে এসে হামলাকারীকে কাবু করেন। বিমানে থাকা অন্য পাইলটেরা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সৌদি আরবের তাবুকে জরুরি অবতরণ করান।
এই সহকারী পাইলটের সঙ্গে সেটিই ছিল তাঁর প্রথম উড়ান। যাত্রার শুরুতে কোনও অস্বাভাবিকতা চোখে পড়েনি। প্রায় দু’ঘণ্টা পরে ফিরতি উড়ানের দায়িত্বে থাকা আর এক ক্যাপ্টেন ককপিটে এসেছিলেন। সহকারী পাইলট প্রার্থনা করার কথা জানিয়ে তাঁকে বাইরে যেতে বলেন। তাতেও সন্দেহ হয়নি মচ্ছরের। সাক্ষাৎকারে মচ্ছর জানান, হামলার আগে তিনি নিজের আসনে বসে কম্পিউটারে উড়ানের সময়সংক্রান্ত তথ্য দেখছিলেন। সহকারী পাইলট তখন তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করছিলেন। হঠাৎ মাথার পিছনে প্রচণ্ড আঘাত লাগে। প্রথম মুহূর্তে কী ঘটেছে বুঝতেই পারেননি তিনি। পরবর্তী মুহূর্তগুলিতে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন, আবার চেতনা ফিরছিল। তাঁর বিবরণে উঠে আসে, স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনের মধ্যে কী ভাবে কোনও পূর্বাভাস ছাড়াই তাঁকে নিজের জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে নামতে হয়েছিল।
মচ্ছরের প্রথমে মনে হয়েছিল, বিমানের ছাদ থেকে কিছু খুলে মাথায় পড়েছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বুঝতে পারেন, তাঁকে আক্রমণ করা হচ্ছে। আঘাতের পরে দৃষ্টিসীমা কয়েক ইঞ্চিতে নেমে এসেছিল। সিটবেল্ট খুলে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করতে গিয়ে হাতেও চোট পান। সাহায্যের জন্য আর এক ক্যাপ্টেনের নাম ধরে চিৎকার করতে থাকেন। একই সঙ্গে চেষ্টা চালান দরজা খোলার সুইচে হাত পৌঁছনোর।
একবার দরজা খুললেও ফের বন্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যেই ইঞ্জিনের শব্দ কমতে শোনেন তিনি, অনুভব করেন বিমান দ্রুত নীচের দিকে নামছে। দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় যন্ত্রের দিকে না তাকিয়েও বিপদ বুঝেছিলেন। পরের ঘটনাগুলির স্মৃতি ছিন্নবিচ্ছিন্ন। মনে আছে, দরজার দিকে পৌঁছতে শরীর ঠেলে এগোনোর চেষ্টা করেছিলেন। পরে নিজেকে ককপিট ও বিমানের খাবার প্রস্তুতের জায়গার মাঝখানে পড়ে থাকতে দেখেন।
দরজা খোলার পরের দৃশ্যের কথা বলতে গিয়ে মচ্ছর জানান, তিনি উপুড় হয়ে পড়েছিলেন। চারপাশে আতঙ্ক, চিৎকার। সেই সঙ্কটের মধ্যে যে সহকর্মী বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেন, তাঁর ভূমিকার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি। সহকর্মীর এই সাহায্যের স্মৃতি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সঙ্গে থাকবে বলে জানান মচ্ছর। তাঁর বয়ানে ব্যক্তিগত সাহসের পাশাপাশি উঠে এসেছে অন্যদের তৎপরতার গুরুত্বও।
বিমানটি নিরাপদে নামার পরে মচ্ছরের চিকিৎসা শুরু হয় সৌদি আরবে। পরে তাঁকে আবু ধাবিতে নিয়ে যাওয়া হয়। মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় হাসপাতালের শয্যা থেকেই সাক্ষাৎকার দেন তিনি। বিপদ কেটেছে বলে প্রথম অনুভব করেন বিমান মাটি ছোঁয়ার সময়। ঘটনার পরে প্রথম কার সঙ্গে কথা বলেছিলেন, সেই প্রশ্নে আবেগাপ্লুত হয়ে দু’বছরের ছেলের কথা জানান।
তবে প্রাণে বাঁচলেও সেই মুহূর্তগুলির অভিঘাত এখনও কাটেনি। মচ্ছর জানিয়েছেন, ঘটনার পরের দিনগুলিতে প্রথম আঘাতের স্মৃতি হঠাৎ ফিরে আসত, কখনও বুক ধড়ফড় করত। বিমানে এক চিকিৎসক তাঁকে সাহায্য করেছিলেন, কর্মীরা চেষ্টা করেছিলেন তাঁকে সজাগ রাখতে। তাঁর কাছে সেই দিনের সবচেয়ে বড় স্মৃতি সকলের বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছা। নিজের পাশাপাশি যাত্রী ও সহকর্মীদের সেই সম্মিলিত লড়াইকেই তিনি মনে রাখতে চান।