বাংলাস্ফিয়ার: দিল্লির ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরে ‘যৌক্তিক অসংগতি’ চিহ্নিত করার প্রক্রিয়ায় মুসলিম ভোটারদের ওপর তুলনামূলক বেশি চাপ পড়েছে। খসড়া তালিকার ভোটারদের ১৩.৬ শতাংশ মুসলিম হলেও নির্বাচন কমিশনের ইআরওনেট সফটওয়্যারে এই ধরনের অসংগতির জন্য চিহ্নিত ভোটারদের মধ্যে তাঁদের অংশ ২০.৩ শতাংশ। পরিবারসংক্রান্ত পাঁচটি মানদণ্ডে চিহ্নিতদের মধ্যে মুসলিমদের অংশ আরও বেশি, ৩০ শতাংশ।

এই হিসাবের অর্থ, খসড়া তালিকায় মুসলিমদের উপস্থিতির তুলনায় অসংগতির তালিকায় তাঁদের প্রতিনিধিত্ব প্রায় দেড় গুণ। পরিবারসংক্রান্ত ওই পাঁচটি ক্ষেত্রে তা দ্বিগুণেরও বেশি। তবে ৩০ শতাংশ সংখ্যাটির অর্থ এই নয় যে দিল্লির সমস্ত মুসলিম ভোটারের ৩০ শতাংশ চিহ্নিত হয়েছেন। এটি ওই বিশেষ মানদণ্ডগুলিতে চিহ্নিত মোট ভোটারের মধ্যে মুসলিমদের অনুপাত।

পরিবারসংক্রান্ত পরীক্ষাগুলির মধ্যে রয়েছে ছয় বা তার বেশি ভোটারের একই ব্যক্তিকে অভিভাবক হিসেবে উল্লেখ করা; বাবা বা মায়ের সঙ্গে সন্তানের বয়সের ব্যবধান ৫০ বছরের বেশি কিংবা ১৫ বছরের কম হওয়া; দাদু বা দিদিমার সঙ্গে নাতি বা নাতনির বয়সের ব্যবধান ৪০ বছরের কম হওয়া; এবং ভাইবোনের জন্মের ব্যবধান নয় মাসের কম হওয়া।

অন্যদিকে, আগের এসআইআরের তালিকার সঙ্গে যোগসূত্র মেলেনি বলে চিহ্নিত ভোটারদের মধ্যে মুসলিমদের অংশ ছিল মাত্র ৭.৬ শতাংশ। অর্থাৎ, পুরনো তালিকার সঙ্গে সংযোগ দেখানোর ক্ষেত্রে তাঁদের অবস্থান তুলনামূলক ভালো হলেও নতুন অসংগতি পরীক্ষায় তাঁদের বেশি চিহ্নিত হতে হয়েছে। এই দুই শ্রেণির ফলাফলের ফারাকই সফটওয়্যারের বাছাইয়ের মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

বিশ্লেষণে ভোটারদের নামের ভিত্তিতে একটি পরিসংখ্যানগত পদ্ধতি ব্যবহার করে ধর্মীয় পরিচয় অনুমান করা হয়েছে। তাই সংখ্যাগুলি সংবাদপত্রের গবেষণালব্ধ হিসাব, কমিশনের প্রকাশিত ধর্মভিত্তিক গণনা নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নমুনা বেছে হাতে মিলিয়েও পদ্ধতির নির্ভুলতা পরীক্ষা করা হয়েছে।

বিহারের অভিজ্ঞতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ তুলনা। সেখানে এসআইআরে নাম বাদ পড়া ভোটারদের ১৮.৪ শতাংশ ছিলেন মুসলিম, যা তাঁদের ১৭.৭ শতাংশ জনসংখ্যাগত অংশের কাছাকাছি। বিহারে দিল্লির মতো ‘যৌক্তিক অসংগতি’ পরীক্ষা হয়নি। তবে দুই রাজ্যের হিসাবের ভিত্তি এক নয়: দিল্লির ক্ষেত্রে আলোচ্য অতিরিক্ত যাচাইয়ের জন্য চিহ্নিত ভোটার, বিহারের ক্ষেত্রে তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটার।

ফলে দিল্লির এই পরিসংখ্যানকে সরাসরি মুসলিমদের নাম বাদ দেওয়ার হার হিসেবে দেখানো ভুল হবে। একইভাবে, শুধু এই তথ্য থেকে পরিকল্পিত ধর্মীয় বৈষম্য প্রমাণিত হয়েছে বলাও ঠিক নয়। কিন্তু একই যাচাইপ্রক্রিয়ার প্রভাব বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ওপর এতটা আলাদা হলে তার কারণ অনুসন্ধানের প্রয়োজন তৈরি হয়। এটি নাগরিকের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বিষয়। বড় পরিবার বা অস্বাভাবিক বয়সের ব্যবধান কেন অতিরিক্ত পরীক্ষার ভিত্তি হবে, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।

এর মধ্যে দিল্লির মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত পৃথক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, নোটিস পাওয়া প্রায় ৩৩ লক্ষ ভোটারের মধ্যে ২০ লক্ষের মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। নিষ্পত্তির মধ্যে যাচাইয়ের পরে নাম রাখার সিদ্ধান্ত এবং আবেদন প্রত্যাখ্যান, উভয়ই রয়েছে। তাই নিষ্পত্তির সংখ্যাকে সকলের ভোটাধিকার সুরক্ষিত হওয়ার প্রমাণ হিসেবে পড়া যায় না।

পরিসংখ্যানটির তাৎপর্য এখানেই: সফটওয়্যারে একই নিয়ম প্রয়োগ হলেই ফল সবার জন্য সমান হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কোন তথ্যকে অসংগতি বলা হচ্ছে, সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি এবং ভুল চিহ্নিতকরণ সংশোধনের সুযোগ স্পষ্ট থাকা জরুরি। নোটিস পাওয়া মানুষকে কী ব্যাখ্যা বা নথি দিতে হচ্ছে, সেটিও যাচাইয়ের বাস্তব বোঝা নির্ধারণ করে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু কতজনকে চিহ্নিত করা হল, তা নয়। তাঁদের কতজনের তথ্য সঠিক প্রমাণিত হল, কতজনের নাম বাদ গেল এবং কী কারণে গেল, তার স্বচ্ছ হিসাব প্রয়োজন। সেই ফলাফল ছাড়া দিল্লির এসআইআরে দেখা দেওয়া এই অসম অনুপাতের পূর্ণ প্রভাব বোঝা সম্ভব নয়।