বাংলাস্ফিয়ার: দুষ্যন্ত গৌতমকে সিকিমের রাজ্যপাল নিয়োগ ঘিরে ভোটমুখী উত্তরাখণ্ডে রাজনৈতিক অস্বস্তিতে পড়েছে বিজেপি। ২০২২ সালে উনিশ বছরের অঙ্কিতা ভান্ডারির হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিতর্কে তাঁর নাম উঠে আসার পরেও কেন তাঁকে সাংবিধানিক পদে বসানো হল, সেই প্রশ্ন তুলে সরব হয়েছে কংগ্রেস। বিরোধী দলের অভিযোগ, এই নিয়োগের মাধ্যমে গৌতমকে আড়াল করার চেষ্টা করছে শাসক দল। বিজেপির পাল্টা বক্তব্য, তাঁর বিরুদ্ধে কোনও প্রমাণ নেই।

আগামী বছরের গোড়ায় উত্তরাখণ্ডে বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা। ২০১৭ সাল থেকে রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি। বৃহস্পতিবার দলের নেতৃত্ব প্রকাশ্যে গৌতমের পাশে দাঁড়ালেও রাজ্যের কয়েকজন নেতা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এই বিতর্ক নির্বাচনী প্রচারে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে কেন্দ্রীয় নেতার নিয়োগকে সমর্থন করার পাশাপাশি স্থানীয় স্তরে জনমতের প্রতিক্রিয়াও সামলাতে হচ্ছে রাজ্য বিজেপিকে। কংগ্রেসের এই অভিযোগ ঘিরেই এখন দলের প্রকাশ্য অবস্থান ও রাজ্য নেতাদের উদ্বেগের মধ্যে ফারাক স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

গৌতম বিজেপির পরিচিত দলিত মুখ। তিনি রাজ্যসভার সাংসদ এবং দলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। অঙ্কিতা হত্যাকাণ্ডে তাঁর নাম নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তা অস্বীকার করেছে বিজেপি। দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থান, প্রমাণ ছাড়া কোনও নেতাকে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করা যায় না। অন্যদিকে, কংগ্রেস নিয়োগের সিদ্ধান্তকেই রাজনৈতিক আক্রমণের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

বিতর্কের সূত্র কিছু ভিডিয়ো ও অডিয়ো ক্লিপ। সেগুলিতে প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক সুরেশ রাঠোরের সঙ্গিনী দাবি করেন, এই অপরাধের সঙ্গে এক ‘ভিআইপি’র যোগ ছিল। সেই বক্তব্যে গৌতমের দিকে ইঙ্গিত করা হয়। তবে ক্লিপে উত্থাপিত অভিযোগকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে দেখা যায় না। নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার জন্য কংগ্রেস ও আম আদমি পার্টির বিরুদ্ধে মানহানির মামলাও করেছেন গৌতম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিজেপি নেতা জানিয়েছেন, ঘটনার পরে রাজ্য সরকার দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেফতারের ব্যবস্থা করেছিল এবং তদন্তের জন্য বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করেছিল। তাঁর বক্তব্য, এক তরুণীর হত্যাকাণ্ড ঘিরে মানুষের ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছিলই। কিন্তু গৌতমকে রাজ্যপাল করার পরে বিষয়টি যেভাবে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে, আগে সেই মাত্রায় আসেনি।

দলের এক নেতার আশঙ্কা, বিশেষত মহিলা ভোটারদের মধ্যে এই বিতর্কের প্রভাব পড়তে পারে। পাহাড়ি অঞ্চলে জনমত গঠনে তাঁদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে, অঙ্কিতার বাবা-মাও নিয়োগ স্থগিত রাখার দাবি জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সামনে তাঁরা বলেন, মামলার অমীমাংসিত অভিযোগগুলির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হওয়ার আগে গৌতমকে রাজ্যপাল করার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা উচিত নয়। তাঁদের দাবি, চলমান সিবিআই তদন্ত শেষ হোক। অঙ্কিতার বাবা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তাঁদের উদ্বেগের সমাধান না হলে উত্তরাখণ্ডের মানুষ রাস্তায় নামবেন।

পরিবার তদন্তের কয়েকটি নির্দিষ্ট দিক নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তারা ২০২২ সালের ১৮ ও ১৯ সেপ্টেম্বরের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ফোনকল ও অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছে। মূল অভিযুক্ত পুলকিত আর্যের পুরনো মোবাইল ফোন উদ্ধার এবং সংশ্লিষ্ট রিসর্ট ভাঙার পরিস্থিতি নিয়েও ব্যাখ্যা চেয়েছে পরিবার। অঙ্কিতার মায়ের বক্তব্য, তাঁদের লড়াই কেবল নিজের মেয়ের জন্য নয়, সমস্ত মেয়ের ন্যায়বিচারের জন্য।

দিল্লির ইন্ডিয়া গেটে অবস্থান চলাকালীন বৃহস্পতিবার ভোরে অঙ্কিতার বাবা-মাকে আটক করেছিল পুলিশ। পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। পরিবারের এই প্রতিবাদ নিয়োগ ঘিরে বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং সাংবিধানিক পদে নিয়োগের সময় নির্বাচন—এই দুই প্রশ্ন এখন পাশাপাশি সামনে এসেছে।

বিজেপির সামনে তাই চ্যালেঞ্জ দ্বিমুখী। একদিকে দলের নেতার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জবাব দেওয়া, অন্যদিকে অঙ্কিতার মৃত্যু ঘিরে মানুষের ক্ষোভ ও পরিবারের ন্যায়বিচারের দাবির মোকাবিলা করা। নির্বাচনের আগে এই বিতর্ক কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে রাজ্য নেতৃত্বের একাংশের উদ্বেগ বুঝিয়ে দিচ্ছে, গৌতমের নতুন পদ উত্তরাখণ্ডে দলের জন্য স্বস্তির খবর হয়ে আসেনি।