বাংলাস্ফিয়ার: সরু রাস্তা, মাথার উপর দিয়ে যাওয়া বিদ্যুতের তার এবং উড়ালপুলের কাছে নানা বাধা পেরিয়ে প্রায় ছ’মাসের যাত্রা শেষ হল বৃহস্পতিবার গভীর রাতে। উত্তরপ্রদেশের লখিমপুর খেরিতে নিজের গন্তব্যে পৌঁছল এক বিশাল রিঅ্যাক্টর। ভারতের প্রথম সমন্বিত চিনি থেকে জৈবপ্লাস্টিক উৎপাদন কারখানার অন্যতম প্রধান যন্ত্র হতে চলেছে এটি।
ওড়িশার পারাদীপ বন্দর থেকে ২৬০ চাকার একটি ট্রেলারে চাপিয়ে এই ‘সাইক্লাইজেশন রিঅ্যাক্টর’ আনা হয়েছে বলরামপুর চিনি মিলসের কুম্ভী কারখানায়। চারটি রাজ্য এবং উত্তরপ্রদেশের সাতটি জেলা পেরিয়ে সড়কপথে প্রায় ১,৩০০ কিলোমিটার অতিক্রম করেছে যন্ত্রটি। দিনে গড়ে এগিয়েছে মাত্র ১০–১২ কিলোমিটার। গোটা পরিবহণে খরচ হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি টাকা।
এই যন্ত্রের আগমন সংস্থার সমন্বিত পলিল্যাকটিক অ্যাসিড বা পিএলএ কারখানা চালু করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। নভেম্বরে কারখানাটিতে উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা।
সংস্থার কুম্ভী ইউনিটের চিফ জেনারেল ম্যানেজার সুনীল কুমার যাদব ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’কে জানিয়েছেন, ছ’মাস ধরে তাঁরা এই যন্ত্রটির অপেক্ষায় ছিলেন। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে যন্ত্রটি কারখানায় পৌঁছনোর পর সেটি বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। আগামী মাসে উৎপাদন শুরু হতে পারে বলে জানান তিনি।
সাইক্লাইজেশন রিঅ্যাক্টরটি এই কারখানার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে আখ থেকে তৈরি হবে পলিল্যাকটিক অ্যাসিড—জৈব উৎসভিত্তিক এক ধরনের পলিমার, যা জৈবপ্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে চালু চিনিকলের পাশেই নতুন কারখানাটি গড়ে তোলা হচ্ছে। এর ফলে উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ের কাজ একই পরিসরে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
যন্ত্রটির বিপুল আকারের জন্য সেটি পরিবহণ করাই হয়ে উঠেছিল বিরাট আয়োজনের বিষয়। ট্রেলারে চাপানো অবস্থায় এর উচ্চতা ছিল প্রায় ২০ ফুট, দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪৭ ফুট এবং প্রস্থ প্রায় ২৩ ফুট। মুম্বইয়ের একটি সংস্থার নিযুক্ত প্রায় ৩৫ জন প্রশিক্ষিত কর্মীর একটি দল গোটা যাত্রাপথে এর সঙ্গে ছিল।
যন্ত্রটির সঙ্গে আসা এক প্রবীণ প্রযুক্তি আধিকারিক ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’কে জানিয়েছেন, সেটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একাধিক জায়গায় বিদ্যুতের তার উঁচু করতে হয়েছে। উড়ালপুলের কাছেও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা সরাতে হয়েছে। যেখানে রাস্তা অতিরিক্ত সরু ছিল, সেখানে ভারী লোহার পাত বিছিয়ে অস্থায়ী পথ তৈরি করা হয়, যাতে ট্রেলারটি ওই অংশ পেরোতে পারে।
পারাদীপ বন্দর থেকে যন্ত্রটির যাত্রা শুরুর কয়েক মাস আগেই ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, বিহার এবং উত্তরপ্রদেশজুড়ে নির্ধারিত পথের বিস্তারিত সমীক্ষা করেছিলেন ইঞ্জিনিয়ারেরা। কোথায় কোথায় বাধা আসতে পারে, কোন রাস্তা ও সেতু এই পরিবহণের উপযুক্ত—তা খতিয়ে দেখা হয়েছিল।
যন্ত্রটির চলাচল নির্বিঘ্ন করতে জেলা প্রশাসনগুলি জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ, পূর্ত দফতর, স্থানীয় পুলিশ ও ট্র্যাফিক পুলিশ, পুর কর্তৃপক্ষ, বন দফতরের আধিকারিক এবং বিদ্যুৎ দফতরের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করে। এক আধিকারিক জানিয়েছেন, শুধু পরিবহণেই প্রায় ১৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। মুম্বইয়ের একটি পরিবহণ সংস্থাকে এই কাজের বরাত দেওয়া হয়েছিল।
উৎপাদনপদ্ধতি ব্যাখ্যা করে যাদব জানান, কাঁচামাল হিসেবে আখ ব্যবহার করে প্রথমে ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করা হবে। তার পরে সেটিকে রূপান্তরিত করা হবে পলিল্যাকটিক অ্যাসিডে। এই পলিমার থেকে তৈরি হবে ছোট ছোট দানা বা পেলেট। বিভিন্ন শিল্পসংস্থা সেই দানা ব্যবহার করে নানা ধরনের পণ্য তৈরি করতে পারবে।
তাঁর কথায়, “উপাদানটি তৈরি হবে আখ থেকে। প্রথমে ল্যাকটিক অ্যাসিড উৎপাদন করা হবে, তার পরে সেটিকে পলিল্যাকটিক অ্যাসিডে রূপান্তরিত করা হবে। এ থেকে দানা তৈরি করা হবে, যা শিল্পসংস্থাগুলি নিজেদের পণ্য তৈরিতে ব্যবহার করতে পারবে।”
পিএলএ হল আখ, ভুট্টার শ্বেতসার এবং অন্যান্য উদ্ভিজ্জ কাঁচামালের মতো পুনর্নবীকরণযোগ্য সম্পদ থেকে তৈরি জৈব উৎসভিত্তিক পলিমার। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে তৈরি প্রচলিত প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহার করা যায়। মোড়ক ও বস্ত্রশিল্প-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর ব্যবহার রয়েছে।
কুম্ভী কারখানার সমন্বিত উৎপাদনব্যবস্থায় বর্তমানে চালু চিনিকলে প্রক্রিয়াকরণ করা আখই নতুন জৈবপলিমার কারখানার কাঁচামালের জোগান দেবে।
বলরামপুর চিনি মিলস লিমিটেড এই প্রকল্পে ৩,০৮০ কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা করেছিল। প্রায় আড়াই বছর ধরে পর্যায়ক্রমে এই অর্থ বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এক প্রবীণ আধিকারিক জানিয়েছেন, সম্পূর্ণ নতুন করে গড়ে তোলা এই কারখানার প্রস্তাবিত বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ৮০ হাজার টন। এটিকে ভারতের প্রথম শিল্পপরিসরে পিএলএ উৎপাদনের কারখানা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।