বাংলাস্ফিয়ারঃ ফ্রান্সে গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে হিংসাত্মক অশান্তির দিনগুলির একটির পরে ‘লাগামহীন হিংসা’র কড়া সমালোচনা করলেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ। দেশজুড়ে বিভিন্ন শহরে সরকারি ভবনে আগুন ধরানো হয়েছে, শত শত দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট চলেছে এবং অন্তত ২,৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভাষণে মাক্রোঁ বলেন, “এই ছবিগুলি দেখে আমরা সকলেই নিজেদের প্রশ্ন করেছি, ফরাসিরা কী করে ফ্রান্সের সঙ্গে এমন করতে পারেন?”
মাক্রোঁ বলেন, হিংসাকে সমর্থন করার মতো “কোনও যুক্তিই নেই”। স্থানীয় সরকারি প্রশাসকেরা প্রয়োজন মনে করলে নির্দিষ্ট কিছু পথসমাবেশ নিষিদ্ধ করতে পারবেন বলেও জানান তিনি।
তাঁর বক্তব্য, জীবনযাত্রার ব্যয় ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে দাবিদাওয়া জানাতে আসা প্রকৃত শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যারা “ধ্বংস করে, তছনছ করে এবং লুটপাট চালায়”, তাদের পার্থক্য করতে হবে। তাঁর ভাষায়, “অতি-বামপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে বহু অপরাধপ্রবণ ব্যক্তি যোগ দিয়েছে।” এই গোষ্ঠীগুলির তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।
শনিবারের হিংসার ব্যাপকতায় সরকার কার্যত অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল বলে মনে হচ্ছে। সরকারি ভবনে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, বাসস্টপ ভাঙচুর করা হয়, রাস্তায় ব্যারিকেড গড়ে তোলা হয় এবং দোকানে ঢুকে ভাঙচুর ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। এর পরেই বাম ও ডান—উভয় শিবিরের রাজনীতিকেরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনেজের পদত্যাগ দাবি করেন। স্পেন, ইতালি ও পর্তুগালেও বিক্ষোভ হয়েছে।
রবিবার বিকেলে মধ্য প্যারিসের প্লাস দ্য লা রেপুব্লিকে জনতার সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। এ নিয়ে টানা দ্বিতীয় দিন হিংসা ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকটি রাস্তায় বৈদ্যুতিক সাইকেল জড়ো করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ছোড়া হয় বোতল ও পাথর। জ্বলন্ত আবর্জনার পাত্র থেকে ঘন ধোঁয়া উঠতে থাকে। পুলিশ পাল্টা কাঁদানে গ্যাস ও তীব্র আলো-শব্দ তৈরি করে সাময়িকভাবে হতবিহ্বল করে দেওয়ার গ্রেনেড ব্যবহার করে।
শনিবার পুলিশ ও প্রশাসনকে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। প্রথমত, প্যারিস-সহ বড় শহরগুলিতে কয়েক দশ হাজার মানুষ শান্তিপূর্ণ মিছিলে যোগ দেন। আরও শিক্ষক নিয়োগ এবং জরাজীর্ণ স্কুলভবন মেরামতের দাবিতে স্কুলপড়ুয়াদের আন্দোলনকে সমর্থন জানান তাঁরা।
চার সপ্তাহ ধরে পথে মিছিল ও স্কুল অবরোধের পরে আয়োজিত এই মিছিলগুলিতে পড়ুয়াদের পাশাপাশি যোগ দেন তাঁদের বাবা-মা, শিক্ষক এবং দাদু-দিদিমারাও। জীবনযাত্রার চড়া ব্যয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে শামিল হন শ্রমজীবী মানুষও। বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা ব্যানারে অভিযোগ করা হয়, সরকার তাঁদের কথা শুনছে না। জনপরিষেবায় আরও অর্থ বরাদ্দের দাবিও জানানো হয়।
কিন্তু এই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভগুলির বাইরে বিভিন্ন গোষ্ঠী এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় জমায়েত করতে থাকে। প্যারিস, বর্দো, নিস ও মার্সেইয়ের মতো শহরে বিক্ষিপ্ত অগ্নিসংযোগ, রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ ও প্রশাসন অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে।
এর পরে রাস্তায় তৈরি হওয়া পরিস্থিতিকে ফরাসি সংবাদমাধ্যম যে “বিশৃঙ্খলা” বলে বর্ণনা করেছে, তার সুযোগ নেয় মুখোশধারী লুটেরারা। তারা দোকানের সামনের কাচ ভেঙে জিনিসপত্র লুট করে। প্যারিসে মুখোশধারী প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষেরা দোকানের সামনের অংশ ভেঙে দেওয়ার পরে লুটেরাদের বিভিন্ন দলকে রাতের অন্ধকারে পোশাক ও জুতোর বাক্স নিয়ে ছুটতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে দেখে শিশু বলেই মনে হচ্ছিল।
প্যারিসে পুলিশের হিসাবে রেকর্ড ৮৫৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রবিবার শহরের রাস্তায় ছড়িয়ে ছিল সাইকেল, আবর্জনার পাত্র ও অন্যান্য জিনিস দিয়ে তৈরি ব্যারিকেডের পোড়া অবশেষ। বেশ কয়েকটি রাস্তায় দেখা যায় দোকানের ভাঙা কাচ এবং আগুনে পুড়ে যাওয়া গাড়ির অবশেষ।
প্যারিসের সমাজতান্ত্রিক দলের উপমেয়র লামিয়া এল আরাজ বলেন, রাজধানী “এমন মাত্রার হিংসা দেখেছে, যা আমার মনে হয় আমরা আগে কখনও দেখিনি”।
মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরে উনিশ শতকের টাউন হলটি আগুনে পুড়ে যায়। মেয়র গিয়োম গেরাঁ বলেন, যাঁরা তাঁর দফতরের ভবনে হামলা চালিয়েছেন, তাঁরা “কোনও দাবির পক্ষে আন্দোলনকারী বিক্ষোভকারী নন”, বরং “যুদ্ধের জন্য সংগঠিত লোকজন”।
তাঁর অভিযোগ, টাউন হলে ঢুকে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হামলাকারীরা ভবনের এক তত্ত্বাবধায়ককে খুন করার হুমকি দিয়েছিল। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদেরও বলেছিল, তাঁদের “পুড়িয়ে মারা হবে”। এই সঙ্কট মোকাবিলায় রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন মেয়র।
গেরাঁ বলেন, “বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ আমাদের পৌর পুলিশ যথেষ্ট সংখ্যায় উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও দাঙ্গাকারীদের হিংসা আর প্রতিহত করতে পারছিল না। কারণ তাদের গোলাবারুদ ফুরিয়ে গিয়েছিল।”
তাঁর কথায়, এটি “রাষ্ট্রের এক বিরাট ব্যর্থতা”।