বাংলাস্ফিয়ার: গত কয়েক সপ্তাহ ধরে স্পেন ও ফ্রান্সকে উত্তাল করে তোলা ক্ষুব্ধ বিক্ষোভ এবার ছড়িয়ে পড়ল ইতালি ও পর্তুগালেও। সপ্তাহান্তে মিলানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে দাঙ্গাকারীরা, বিভিন্ন সম্পত্তিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। অন্যদিকে, লিসবনে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান শুরু করেছেন বিক্ষোভকারীরা।

জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে শনিবার মিলানের কেন্দ্রস্থলে মিছিলটি শুরু হয়েছিল শান্তিপূর্ণভাবে। কিন্তু শেষপর্যন্ত মুখোশধারী দাঙ্গাকারীরা দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে মোতায়েন পুলিশের দিকে পাথর, ফুটপাতের পেভিং ব্লক ও অন্যান্য জিনিস ছুড়তে থাকে। পানশালার টেবিল দিয়ে তৈরি ব্যারিকেডেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। ঘটনার পরের ছবিতে ইতালির ক্যারাবিনিয়েরি বাহিনীর একটি গাড়িকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় দেখা যায়।

সংবাদ সংস্থা লা প্রেস জানিয়েছে, অন্তত দু’জন পুলিশকর্মী আহত হয়েছেন। প্রায় ৫০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে, যাঁদের মধ্যে অনেকেই অপ্রাপ্তবয়স্ক।

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি বলেছেন, বিক্ষোভ দেখানো মানুষের অধিকার হলেও “আমাদের শহরগুলিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া কোনও অধিকার নয়।” সমাজমাধ্যমে একটি পোস্টে তাঁর অভিযোগ, “দাঙ্গাবাজেরা” এই বিক্ষোভকে ব্যবহার করেছে “বিশৃঙ্খলা ছড়াতে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের আক্রমণ করতে এবং গোটা শহরকে জিম্মি করে রাখতে।”

মিলানের মধ্য-বামপন্থী মেয়র জুসেপ্পে সালা বলেন, “বিক্ষোভের কারণগুলি বোঝা যায়। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে হিংসা এবং শহরের গুরুতর ক্ষয়ক্ষতি কোনওভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।”

লিসবনে আবাসন সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভকারীরা তাঁবু খাটিয়ে শিবির গড়ে তুলেছেন। তিন সপ্তাহ আগে মাদ্রিদে তৈরি হওয়া বিক্ষোভশিবিরের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে এই অবস্থান।

দেশজুড়ে হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে মিছিলের পর রাতে কয়েকশো বিক্ষোভকারী জড়ো হন রোসিয়ো স্কোয়ারে। পর্তুগালের রাজধানীর ব্যস্ত, পর্যটকসমাগমে মুখর কেন্দ্রস্থলে এই চত্বর।

অংশগ্রহণকারীরা সারা রাত সেখানে থাকার সংকল্প করেন। চত্বরের প্রধান আকর্ষণ রাজা চতুর্থ পেদ্রোর মূর্তির চারপাশে বসে কয়েকশো মানুষ গান গাইতে থাকেন।

৪৬ বছর বয়সি সমাজকর্মী এলেনা কোস্তা বলেন, “পর্তুগালের যে শ্রেণির মানুষ কর দেন, যাঁরা এই দেশটাকে সচল রাখেন, তাঁরাই আজ আক্রমণের মুখে। তাঁরা নিজেদের অধিকার হারাচ্ছেন, বিশেষত বাসস্থানের অধিকার। তাই আমরা সবাই একসঙ্গে এখানে এসেছি বোঝাতে যে, আমাদের দম বন্ধ হয়ে আসছে।”

৫২ বছর বয়সি ইঞ্জিনিয়ার আন্তোনিও মারগাদো দেশের মধ্য-ডানপন্থী সরকারের সমালোচনা করে বলেন, “ভাড়ার ক্ষেত্রে সব নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হচ্ছে। বাড়ির মালিকেরা ক্রমশ বেশি সুরক্ষা পাচ্ছেন। অথচ যেসব ভাড়াটের মাথার উপর একটি ছাদ প্রয়োজন, তাঁদের সুরক্ষা ক্রমশ কমছে।”

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পর্তুগালে বাড়ির দাম বেড়েছে ১২৪ শতাংশ। বৃদ্ধির এই হার ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় হারের প্রায় দ্বিগুণ। এর অভিঘাত বিশেষভাবে তীব্র তরুণদের উপর এবং লিসবনে বসবাসকারী মানুষের ক্ষেত্রে। পর্তুগালের ১ কোটি ১০ লক্ষেরও বেশি বাসিন্দার প্রায় এক-চতুর্থাংশ থাকেন বৃহত্তর লিসবন মহানগর এলাকায়।

উত্তরের শহর পোর্তোতে শুরু হওয়া আবাসন আন্দোলনকে আরও জোরালো করেছে শনিবার লিসবনে গড়ে ওঠা এই শিবির। পোর্তোতে ইতিমধ্যেই কয়েক ডজন তাঁবু খাটানো হয়েছে।

এর আগে প্রধান শ্রমিক সংগঠন সিজিটিপি-র ডাকে লিসবনে আয়োজিত বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা উন্নত জনপরিষেবা, পেনশন ও মজুরির দাবি জানান। সেই সঙ্গে লাগামছাড়া আবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপের দাবিও ওঠে।

পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্টেনেগ্রো বলেছেন, তাঁর সরকার বুঝতে পারছে, মানুষ “সরকারি নীতিতে তাঁদের চোখে যে ঘাটতি রয়েছে, তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে” চাইছেন। তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সতর্ক করে তিনি বলেছেন, “পর্তুগালে এমন অস্থিরতা ও বিক্ষোভের পরিবেশ আমদানি করার চেষ্টা করবেন না, যার প্রতি বাস্তবে পর্তুগিজ সমাজের সমর্থন নেই।” সম্ভবত ফ্রান্সের সহিংস বিক্ষোভের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন তিনি।

এই সপ্তাহে আলবেনিয়াতেও সহিংস বিক্ষোভ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অবস্থা এবং চড়া শিক্ষাব্যয় নিয়ে ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগ দাবি করেছেন।

শনিবার বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দিকে পাথর, পেট্রলবোমা, ধাতব বস্তু ও আতশবাজিজাতীয় বিস্ফোরক ছোড়ে। গাড়ি ও আবর্জনার পাত্রে আগুন ধরিয়ে সেগুলিকে জ্বলন্ত ব্যারিকেড হিসেবে ব্যবহার করে পুলিশের অগ্রগতি ঠেকানোর চেষ্টা হয়।

হিংসা যে আরও তীব্র হচ্ছে, তার লক্ষণ হিসেবে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে রাবার বুলেট ছোড়ে পুলিশ। রাত পর্যন্ত বিক্ষোভ চলতে থাকে। একটি আদালত, কয়েকটি ব্যাংক ও একটি ডাকঘর-সহ বিভিন্ন ভবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় অথবা সেগুলির ব্যাপক ক্ষতি করা হয়।

বলকান অঞ্চলের দেশটিতে কয়েক মাস ধরে চলা সরকারবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এই অশান্তি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত একটি বিতর্কিত রিসর্ট নির্মাণ প্রকল্পকে ঘিরে প্রথমে এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল।

স্পেনে বাড়তে থাকা ভাড়া ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে জমে থাকা ক্ষোভ গত মাসে ফেটে পড়ে। একটি বিনিয়োগ সংস্থা এক ৮৭ বছর বয়সি মহিলার ফ্ল্যাট কিনে নেওয়ার পর ভাড়া ২৩০ শতাংশ বাড়ানোর দাবি জানায়। সেই বর্ধিত ভাড়া দিতে না পারায় তাঁকে তাঁর বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়।

প্রয়াত মারিয়া দেল কারমেন আবাসকালের এই দুর্দশা এবং তার মধ্যে ফুটে ওঠা বৃহত্তর সংকট মানুষকে রাস্তায় নামায়। স্পেনের রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে গড়ে ওঠে বিক্ষোভশিবির। বাসস্থানের সুযোগ সহজলভ্য করা ও তা সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্যে জরুরি ব্যবস্থা প্রস্তাব করতে উদ্যোগী হয় সমাজতন্ত্রীদের নেতৃত্বাধীন সরকার।

কিন্তু কংগ্রেসে ডানপন্থী ও অতি-ডানপন্থী দলগুলি ভোট দিয়ে সেই প্রস্তাবগুলি খারিজ করে দেয়। এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ নভেম্বরের শেষে আগাম সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা করেন।

ফ্রান্সে প্যারিসের উত্তর প্রান্তের দরিদ্র শহরতলিগুলির স্কুলে শিক্ষকদের অনুপস্থিতি এবং জরাজীর্ণ পরিকাঠামো নিয়ে ক্ষোভ ক্রমে দেশব্যাপী আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। বৈষম্য, অপর্যাপ্ত সরকারি ব্যয় এবং মানের অবনতির বিরুদ্ধে ছড়িয়ে পড়েছে সেই আন্দোলন।

শনিবার ফ্রান্সে ১,২০০-রও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হাইস্কুলের পড়ুয়াদের সমর্থনে পথে নামা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরে কয়েকটি বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বিভিন্ন ভবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং দোকানপাটে লুটপাট চলে।