আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রাক্তন বিচারপতি নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওই আদালতের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করল আমেরিকা। শুক্রবার মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিওর ঘোষণায় আরও এক ধাপ এগোল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আইসিসির সংঘাত। আদালতের কাজকর্ম কার্যত অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে ওয়াশিংটন। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, নোবেলজয়ী ওই বিচারপতি কিছু দিন আগেই আইসিসির বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক আক্রমণ নিয়ে সতর্ক করেছিলেন।
আইসিসিকে ‘দুর্বৃত্ত আদালত’ আখ্যা দিয়ে রুবিও জানান, এই আদালতের সঙ্গে লেনদেন নিষিদ্ধ করবে আমেরিকা। এক বিবৃতিতে তাঁর হুঁশিয়ারি, “হয় আইসিসি তার হুমকি দেওয়া বন্ধ করবে, নয়তো আমরা আইসিসিকেই শেষ করে দেব।”
তবে নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে একাধিক ছাড় রাখা হয়েছে। ফলে তার তাৎক্ষণিক প্রভাব কিছুটা সীমিত হতে পারে। এই ছাড় কার্যত ছয় মাসের অবকাশ দিচ্ছে আদালতের সদস্য দেশগুলিকে। মার্কিন বিদেশ দফতর জানিয়েছে, আমেরিকার উদ্বেগ দূর করতে ‘অর্থবহ অগ্রগতি’ দেখানোর জন্যই এই সময় দেওয়া হয়েছে। সেই প্রচেষ্টার সাফল্য বা ব্যর্থতার ভিত্তিতে অবকাশের মেয়াদ বদলানো হতে পারে।
মার্কিন সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে আইসিসি একে আন্তর্জাতিক আইনের উপর আক্রমণ বলে বর্ণনা করেছে। আদালতের বিবৃতিতে সতর্কবার্তা, “ইতিহাস এই মুহূর্তের বিচার করবে।”
বিশ্বজুড়ে সমালোচনা
আমেরিকার এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে একাধিক দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান ও যুক্তরাজ্য-সহ কয়েকটি দেশ যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা এই ঘোষণার সঙ্গে ‘তীব্র দ্বিমত’ পোষণ করে।
রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিয়ো গুতেরেস মার্কিন সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার সম্মিলিত প্রচেষ্টার উপর ‘গুরুতর আঘাত’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, সেই বিচারব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ আইসিসি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নও নিষেধাজ্ঞাকে ‘অত্যন্ত দুঃখজনক’ বলে বর্ণনা করেছে। আদালত যাতে স্বাধীন ভাবে কাজ চালিয়ে যেতে পারে, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে তারা। ইউরোপীয় কমিশনের আশা, নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের ক্ষেত্রে ছয় মাসের এই অবকাশ আলোচনার সুযোগ তৈরি করবে।
মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিভিন্ন দেশকে মার্কিন পদক্ষেপ প্রতিরোধ করার আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটির অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য আইসিসিকে আন্তর্জাতিক মহল থেকে বিচ্ছিন্ন করে শেষ পর্যন্ত ধ্বংস করে দেওয়া।
অন্য দিকে, গাজায় সংঘটিত কথিত অপরাধের অভিযোগে যাঁর বিরুদ্ধে আইসিসি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে, সেই ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু মার্কিন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। এক্সে তাঁর দফতরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “আইসিসি কোনও আদালত নয়। এটি একটি রাজনৈতিক সংস্থা, যা বিশ্বজুড়ে আইন মেনে চলা গণতান্ত্রিক দেশগুলি এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের ধারণার অস্তিত্বের পক্ষেই বিপজ্জনক হুমকি।”
নোবেলজয়ী নাভি পিল্লাই কে?
যে দিন আইসিসির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা করল ওয়াশিংটন, সে দিনই নরওয়ের নোবেল কমিটি দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ নাভি পিল্লাইকে শান্তি পুরস্কার দেয়। ৮৫ বছরের এই আইনজ্ঞ ভারতীয় বংশোদ্ভূত। রোয়ান্ডার গণহত্যার বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। পরে আইসিসির বিচারপতি হিসেবেও কাজ করেছেন। রাষ্ট্রপুঞ্জের একটি কমিশনের নেতৃত্বেও ছিলেন পিল্লাই, যে কমিশন গাজায় ইজরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ তোলে।
তবে রুবিওর বিবৃতিতে পিল্লাই কিংবা তাঁর নোবেল পুরস্কারের কোনও উল্লেখ ছিল না। মার্কিন বিদেশসচিবের বক্তব্য, আমেরিকা কখনও আইসিসির সদস্য হয়নি। তাই এই আদালতের বিচারপ্রক্রিয়ার হাত থেকে মার্কিন নিরাপত্তাকর্মী ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের রক্ষা করতেই নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন।
রুবিও বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কখনওই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে আমেরিকানদের বিচারের মুখোমুখি করতে দেবেন না।” তাঁর দাবি, নিষেধাজ্ঞার ফলে আদালতের অর্থ ও অন্যান্য সংস্থানের জোগান ব্যাহত হবে, এমনকি তার কাজ চালানোর ক্ষমতাও পঙ্গু হয়ে যেতে পারে।
ওয়াশিংটনের চাপে আইসিসি?
রুবিওর দাবি, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আমেরিকা স্পষ্ট করে এসেছে, আইসিসির কাছ থেকে তারা কী ধরনের পদক্ষেপ আশা করে। আদালতের কাছ থেকে ‘সদিচ্ছার প্রাথমিক নিদর্শন’ পাওয়ার আশায় এত দিন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল। কিন্তু আমেরিকার উদ্বেগ দূর করতে আদালত কিংবা তার সদস্য রাষ্ট্রগুলি কোনও ‘অর্থবহ পদক্ষেপ’ করেনি বলেই দাবি তাঁর।
যেসব মার্কিন মিত্রদেশ আইসিসির সদস্য এবং নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য আমেরিকার সেনাবাহিনীর উপর নির্ভরশীল, তাদেরও আদালতের উপর চাপ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন রুবিও। তাঁর হুঁশিয়ারি, তা না হলে ওয়াশিংটন আইসিসিকে ‘ইটের পর ইট খুলে’ গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলকে ঘিরে আইসিসির তদন্তের জেরেই ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে আদালতের সঙ্গে যুক্ত ১৭ জনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তাঁদের মধ্যে আদালতের কৌঁসুলি এবং কয়েক জন বিচারপতিও রয়েছেন। আমেরিকার মতো ইজরায়েলও আইসিসির সদস্য নয়।
গত মাসে ট্রাম্প আইসিসিকে ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া’ একটি ‘দুর্বৃত্ত প্রতিষ্ঠান’ বলে আক্রমণ করেছিলেন। একই সঙ্গে আদালতের সব সদস্য রাষ্ট্রকে আইসিসি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।
নাভি পিল্লাইয়ের নোবেলজয় এবং তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আইসিসির বিরুদ্ধে আমেরিকার নতুন পদক্ষেপ—দুই ঘটনা ঘিরে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রশ্ন নতুন করে সামনে এল। এখন নজর, ছয় মাসের অবকাশের মধ্যে ওয়াশিংটন ও আইসিসির মধ্যে কোনও সমঝোতার পথ তৈরি হয় কি না।