রাশিয়ার প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমশ নরম হয়ে আসা মনোভাবে ক্ষোভ বাড়ছে তাঁর নিজের দলেই। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে প্রেসিডেন্টের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে কয়েক জন রিপাবলিকান নেতা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ট্রাম্পের কর্মসূচিতে অর্থবরাদ্দের ক্ষেত্রে সমর্থন তুলে নিতে পারেন তাঁরা।

নেব্রাস্কার বিদায়ী কংগ্রেস সদস্য ডন বেকন ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলিকে ‘চূড়ান্ত লজ্জাজনক’ বলে আক্রমণ করেছেন। তাঁর নিশানায় রয়েছে রাশিয়া থেকে ডিজেল কেনার চুক্তি এবং মস্কোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্ত। বেকনের অভিযোগ, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মতো এক ‘যুদ্ধাপরাধীর’ সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছেন ট্রাম্প।

সোমবার সিএনএন-কে বেকন বলেন, “এটা সত্যিই লজ্জাজনক। আমার সঙ্গে যেসব রিপাবলিকানের ওঠাবসা, তাঁদের অনেকেই—সংখ্যাটা মোটেই কম নয়—এটা মেনে নিতে পারছেন না। আমার মনে হয়, বর্তমান কংগ্রেসে প্রেসিডেন্টের প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা শেষ হয়ে গিয়েছে।”

ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের সহযোগী প্রয়াত সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে প্রণীত একটি আইনের আওতায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। গত মাসে সেই আইনে সই করার পর গত সপ্তাহেই তা থেকে ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প। ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের চার বছরেরও বেশি সময় পর এই আইনের লক্ষ্য ছিল মস্কোর উপর আর্থিক চাপ আরও বাড়ানো।

কিন্তু সেই চাপ বাড়ানোর বদলে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ডিজেল আমদানির বিষয়ে পুতিনের সঙ্গে তাঁর চুক্তি হয়েছে। অথচ ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধের জেরেই আমেরিকায় ডিজেলের দাম বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর আগে ইউক্রেনের হামলাকেই রাশিয়ার পরিস্থিতির জন্য দায়ী করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

সপ্তাহান্তে ট্রাম্পের দাবি, রাশিয়ার উপর ইউক্রেনের হামলার প্রভাব নিয়ে সে দেশের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির “কোনও মাথাব্যথা নেই”। ইউরোপের আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন বলেই জেলেনস্কি “এই যুদ্ধ শেষ করতে চান না, সম্ভবত কখনও চানওনি”—এমন অভিযোগও করেন তিনি।

সোমবার জেলেনস্কির সরে দাঁড়ানো উচিত বলেও ইঙ্গিত দেন ট্রাম্প। তাঁর কথায়, “এ বার ইউক্রেনের হয়ে অন্য কারও আলোচনায় বসার সময় এসেছে।”

অন্য দিকে, ব্লুমবার্গকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, তাঁর আশঙ্কা, রাশিয়ার দাবি মেনে নিতে এবং “ইউক্রেনকে আত্মসমর্পণে রাজি করাতে” চাপ সৃষ্টি করছেন ট্রাম্প। তবে সমাজমাধ্যমে তিনি আমেরিকার সঙ্গে ইউক্রেনের অংশীদারির প্রতি নিজের অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

ট্রাম্পের অবস্থানের বিরোধিতা করেছেন দক্ষিণ ক্যারোলাইনার সেনেটর ডারলিন গ্রাহামও। প্রয়াত সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের বোন ডারলিন শনিবার সাংবাদিকদের বলেন, “ব্যক্তিগত ভাবে আমি যুদ্ধ শেষ করতে এবং জ্বালানির দাম কমাতে রাশিয়ার উপরই চাপ দেওয়ার পথ বেছে নিতাম। কারণ, আমি পুতিনকে বিশ্বাস করি না, রাশিয়াকেও বিশ্বাস করি না।”

‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর সাম্প্রতিক একটি সম্পাদকীয়ের প্রতিক্রিয়ায় লুইজিয়ানার বিদায়ী মার্কিন সেনেটর বিল ক্যাসিডি সমাজমাধ্যম এক্স-এ লেখেন, “রোনাল্ড রেগান এবং লিন্ডসে গ্রাহাম এ দেখে লজ্জিত হতেন।”

প্রাক্তন রিপাবলিকান সেনেটর ও প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মিট রমনিও ট্রাম্পের অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। সমাজমাধ্যমে তাঁর বক্তব্য, আমেরিকা যদি ইউক্রেনকে পরিত্যাগ করে, তা হলে কার্যত “স্বাধীনতাকেও পরিত্যাগ করবে”।

ইউক্রেনের প্রতি ট্রাম্পের সমর্থন নিয়ে রিপাবলিকানদের একাংশের উদ্বেগ অবশ্য নতুন নয়। গত সপ্তাহেই ইউক্রেনের আধিকারিকেরা অভিযোগ করেন, স্টারশিল্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাঁদের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। ইলন মাস্কের সংস্থা স্টারলিঙ্কের উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেট পরিষেবার সামরিক সংস্করণ হল স্টারশিল্ড। সমাজমাধ্যমে মাস্কের ইঙ্গিত, ইউক্রেনের এই পরিষেবা ব্যবহারের সুযোগ নিয়ন্ত্রণ করছে মার্কিন সরকার।

এরই মধ্যে রবিবার সন্ধ্যায় জেলেনস্কি অভিযোগ করেন, আসন্ন রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য গোপন করেছে মার্কিন সরকার। একই ধরনের অভিযোগ এই নিয়ে তৃতীয় বার তুললেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট।

সব মিলিয়ে, রাশিয়া নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান এখন শুধু ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহলেই নয়, তাঁর নিজের দলের মধ্যেও অস্বস্তি বাড়াচ্ছে। ইউক্রেন প্রশ্নে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে রিপাবলিকানদের একাংশ যদি সত্যিই অর্থবরাদ্দে সমর্থন প্রত্যাহার করেন, তা হলে ট্রাম্পের সামনে নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে।