জেফ্রি এপস্টিনের দীর্ঘদিনের আইনজীবী ড্যারেন ইন্ডাইক এবং হিসাবরক্ষক রিচার্ড কানের বিরুদ্ধে বুধবার দেওয়ানি মামলা দায়ের করলেন নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল। অভিযোগ, এপস্টিনের যৌন নির্যাতন ও পাচারের অপরাধে তাঁরা সহায়তা করেছেন এবং সেই অপরাধ আড়াল করতে ভূমিকা নিয়েছেন। মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এপস্টিনের রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে তাঁদের অর্থপ্রদান বন্ধ রাখার নির্দেশও চেয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

নিউ মেক্সিকোর ফেডারেল জেলা আদালতে দায়ের করা মামলায় ইন্ডাইক ও কানকে ব্যক্তিগতভাবে এবং এপস্টিনের সম্পত্তি বণ্টন ও উইল কার্যকর করার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবেও বিবাদী করা হয়েছে। এপস্টিনের রেখে যাওয়া সম্পত্তি বা ‘এস্টেট’ এবং সেই সম্পদের মালিকানাধারী ‘১৯৫৩ ট্রাস্ট’-কেও মামলার আওতায় আনা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, “সহযোগীদের সাহায্যে এপস্টিন নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পাচার করেছেন, অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন এবং তাঁদের উপর নির্যাতন চালিয়েছেন মনোরম নানা জায়গায়।” সেই জায়গাগুলির মধ্যে ছিল নিউ মেক্সিকোর স্ট্যানলিতে তাঁর ‘জোরো র‍্যাঞ্চ’ নামে পরিচিত খামারবাড়িও।

অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, “এপস্টিনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং সে বিষয়ে নীরব থাকার বিনিময়ে তাঁর সহযোগীরা মোটা বেতন, অভিজাত সামাজিক বৃত্তে প্রবেশের সুযোগ এবং বহুমূল্য উপহার পেয়েছেন। এমনকি তাঁর কয়েক মিলিয়ন ডলারের সম্পত্তির সুবিধাভোগী হিসেবেও তাঁদের নাম রাখা হয়েছিল।”

অভিযোগ অস্বীকার দুই বিবাদীর

বুধবার ইন্ডাইকের এক আইনজীবী তাঁর এবং কানের পক্ষে বিবৃতি দিয়ে অভিযোগগুলি জোরের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন। বিবৃতিতে বলা হয়, “নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেলের এই অভিযোগ আমরা জোরের সঙ্গে অস্বীকার করছি যে, তাঁরা মি. এপস্টিনের যৌন নির্যাতন বা পাচারে সহযোগী ছিলেন, কিংবা জেনেশুনে কোনও ভাবে তাতে সহায়তা করেছিলেন। সমস্ত বিবরণ অনুযায়ী, ওই ঘটনাগুলি ঘটেছিল বন্ধ দরজার আড়ালে, নির্জন জায়গায় এবং এমন সময়ে, যখন মি. ইন্ডাইক বা মি. কান—কেউই সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।”

বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়েছে, কোনও মহিলা কখনও ইন্ডাইক বা কানের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন করা কিংবা তা প্রত্যক্ষ করার অভিযোগ আনেননি। তাঁদের কাছে এপস্টিনের নির্যাতন সম্পর্কে কোনও অভিযোগ জানানো হয়েছিল, এমন দাবিও কেউ করেননি। বিবৃতির দাবি, নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেলের অভিযোগপত্রেও এর বিপরীত কোনও তথ্য নেই।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মামলা দায়েরের আগে অ্যাটর্নি জেনারেল বা তাঁর দফতরের কেউই প্রাসঙ্গিক তথ্য জানতে ইন্ডাইক ও কানের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। এতে তদন্তের পূর্ণতা এবং মামলার পিছনে অ্যাটর্নি জেনারেলের উদ্দেশ্য নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে বলে দাবি করেছেন তাঁদের আইনজীবী।

চলতি বছরের গোড়ায় এপস্টিন-কাণ্ডের তদন্তকারী মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের কমিটিকেও কান ও ইন্ডাইক জানিয়েছিলেন, এপস্টিনের অধীনে কাজ করার সময়ে তাঁর অপরাধ সম্পর্কে তাঁদের কোনও ধারণা ছিল না।

কোটি কোটি ডলারের লেনদেন

মামলায় ইন্ডাইক ও কানের বিরুদ্ধে এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্কের সুবাদে ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এপস্টিন এবং তাঁর সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলির কাছ থেকে ইন্ডাইক ১ কোটি ৬০ লক্ষ ডলারেরও বেশি এবং কান ১ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ পেয়েছিলেন।

মামলায় অ্যাটর্নি জেনারেলের অন্যতম আবেদন, বিচার চলাকালীন এপস্টিনের এস্টেট থেকে ওই দু’জনের অর্থপ্রদান বন্ধ রাখতে আদালত নির্দেশ দিক।

বুধবার এক বিবৃতিতে নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল টোরেজ বলেন, এপস্টিন “একা কাজ করেননি। তাঁর অপরাধ সম্ভব করে তুলতে যাঁরা সাহায্য করেছেন, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনার চেষ্টা তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না।”

টোরেজের কথায়, “এই মামলার অভিযোগে এমন একদল মানুষ এবং আর্থিক ব্যবস্থার বিবরণ উঠে এসেছে, যা অসহায় কিশোরী ও তরুণীদের উপর নির্যাতন চালিয়ে যেতে এবং তা গোপন রাখতে সাহায্য করেছে। নিউ মেক্সিকোতেও এমন ঘটনা ঘটেছে। যাঁদের বিরুদ্ধে এই শোষণ সম্ভব করে তোলার অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের তা থেকে লাভবান হতে দেওয়া উচিত নয়, যখন নির্যাতনের শিকার মানুষদের এখনও তার পরিণাম বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।”

অভিযোগপত্রে তিনি আরও লিখেছেন, এই মামলার মাধ্যমে রাজ্য অভিযুক্তদের জবাবদিহির আওতায় আনতে এবং এপস্টিনের সম্পদ যাতে তাঁর অপরাধের শিকার মানুষদের মধ্যে বণ্টিত হয়, তা নিশ্চিত করতে চায়।

‘জবাবদিহির অধিকার রয়েছে নির্যাতিতদের’

এপস্টিনের নির্যাতনের শিকার কয়েকজন বুধবার টোরেজের মামলাকে সমর্থন জানিয়ে একটি চিঠিতে সই করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, এই মামলা ইন্ডাইক ও কানের ভূমিকা প্রকাশ করতে, নির্যাতিতদের অভিযোগ তাঁরা কী ভাবে সামলেছিলেন তা খতিয়ে দেখতে এবং এপস্টিনের সংগঠনে ভূমিকা পালনের জন্য তাঁর বিশ্বস্ত সহযোগীরা যাতে পুরস্কৃত না হন, তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারে।

চিঠিতে তাঁরা লিখেছেন, “নির্যাতনের শিকার মানুষদের জবাবদিহি পাওয়ার এবং শপথ নিয়ে দেওয়া উত্তর জানার অধিকার রয়েছে। এপস্টিনের বেছে নেওয়া আস্থাভাজনদের শেষ কথা বলার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়—অর্থও তাঁদের পাওয়া উচিত নয়।”

বুধবার নতুন মামলা নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে এপস্টিনের নির্যাতনের শিকার আনুশকা ডি জর্জিও ‘নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়ানোর’ জন্য টোরেজকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, “অনেক দিন ধরে আমরা এই বোঝা বয়ে চলেছি। এবার যাঁরা দায়ী, তাঁদের নিজেদের ভূমিকার জন্য জবাব দেওয়ার সময় এসেছে।”

নথি প্রকাশ নিয়ে বিচার বিভাগের সঙ্গে সংঘাত

নতুন মামলা ঘোষণার সময়েই নিউ মেক্সিকোর কর্তৃপক্ষ এবং মার্কিন বিচার বিভাগের মধ্যে এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি নিয়ে পৃথক বিরোধ চলছে। রাজ্যে এপস্টিনের সম্ভাব্য অপরাধের তদন্তের জন্য টোরেজ বিচার বিভাগের কাছে নথি চাইছেন। তদন্তের আওতায় রয়েছে সান্তা ফের বাইরে তাঁর খামারবাড়িও, যেখানে একাধিক নির্যাতিত তাঁদের উপর নিপীড়নের অভিযোগ জানিয়েছেন।

আগস্টে টোরেজ বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাঁর অভিযোগ, ওই বিভাগ এবং মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ রাজ্যের তদন্তে বাধা দিচ্ছেন। ফেব্রুয়ারিতে তদন্ত নতুন করে শুরু হয়েছিল। বিচার বিভাগের হাতে থাকা এপস্টিন-সংক্রান্ত নথির সম্পূর্ণ, কোনও অংশ আড়াল না-করা সংস্করণ পাওয়ার জন্য আদালতের দ্বারস্থ হন টোরেজ। তাঁর আবেদনে বলা হয়, রাজ্যের সরকারি আইনজীবীরা নথিগুলি দেখতে চাইলেও বিচার বিভাগের “ধারাবাহিক বাধার মুখে” পড়েছেন।

মামলাটি এখনও চলছে। সম্প্রতি বিচার বিভাগ সেটি খারিজ করার আবেদন জানিয়েছে। তাদের যুক্তি, আইন প্রয়োগ-সংক্রান্ত তথ্য ভাগ করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট সংস্থার বিবেচনাধীন। নথির কোনও অংশ আড়াল না করে প্রকাশ করলে নির্যাতিতদের গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হতে পারে বলেও দাবি করেছে তারা।

নতুন করে নজরে জোরো র‍্যাঞ্চ

গত বছরের শেষ দিকে এবং চলতি বছরের গোড়ায় বিচার বিভাগ এপস্টিন-সংক্রান্ত প্রায় ৩০ লক্ষ ফাইল প্রকাশ করার পর তাঁর জোরো র‍্যাঞ্চ নতুন করে আলোচনায় আসে। ফেব্রুয়ারির গোড়ায় দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছিল, সদ্য প্রকাশিত নথিতে এই খামারবাড়ির হাজার হাজার উল্লেখ রয়েছে। সম্পত্তিটিতে পুরুষ ও অল্পবয়সি মেয়েদের বহু ছবিও পাওয়া গিয়েছে। এপস্টিনের নির্যাতনের শিকার কয়েকজন এর আগেও সেখানে তাঁদের উপর হওয়া নির্যাতন সম্পর্কে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

দ্য গার্ডিয়ান-এর অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, পাম বিচ, নিউ ইয়র্ক এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে এপস্টিনের ব্যক্তিগত দ্বীপের সম্পত্তিগুলির মতো নিউ মেক্সিকোর এই খামারবাড়িতেও কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ কখনও তল্লাশি চালায়নি বলেই মনে হচ্ছে।

ফেডারেল যৌন পাচার মামলার বিচারের অপেক্ষায় থাকাকালীন ২০১৯ সালে ম্যানহাটনের একটি কারাগারে এপস্টিনের মৃত্যু হয়। ১৯৯৩ সালে তিনি নিউ মেক্সিকোর ওই সম্পত্তি কিনেছিলেন। পরে ২০২৩ সালে তাঁর এস্টেটের পক্ষ থেকে সেটি বিক্রি করা হয়।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে টোরেজ ঘোষণা করেন, খামারবাড়িতে এপস্টিনের কর্মকাণ্ড নিয়ে নিউ মেক্সিকো নতুন করে তদন্ত শুরু করবে। এর আগে ২০১৯ সালে নিউ ইয়র্কের ফেডারেল সরকারি কৌঁসুলিদের অনুরোধে রাজ্যের প্রাথমিক তদন্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল। ওই কৌঁসুলিরা এপস্টিনের যৌন পাচার চক্রের তদন্ত চালাচ্ছিলেন, যার জেরে তিনি গ্রেফতার হন। মার্চে নিউ মেক্সিকোর কর্তৃপক্ষ খামারবাড়িতে তল্লাশি শুরু করে।

টোরেজ জানিয়েছেন, জোরো র‍্যাঞ্চে ঠিক কী ঘটেছিল, তা প্রতিষ্ঠা করতে চান তিনি। ওই খামারবাড়ির কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখতে নিউ মেক্সিকোর আইনপ্রণেতারাও একটি ‘সত্য অনুসন্ধান কমিশন’ গঠন করেছেন।