আমেরিকায় জ্বালানির চড়া দাম নিয়ে যখন নাজেহাল সাধারণ মানুষ, তখনই রাশিয়ার সঙ্গে বড়সড় ডিজেল সরবরাহ চুক্তির কথা ঘোষণা করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার তাঁর ঘোষণা, বিশ্ববাজারে প্রায় ৫০ লক্ষ টন ডিজেল সরবরাহ করতে পারে মস্কো। জ্বালানির দাম কমাতে রাশিয়ার দিকেই কি তবে হাত বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন?
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলার পরই এই চুক্তির কথা জানান ট্রাম্প। এর পরপরই মার্কিন অর্থ দফতর একটি সাময়িক সাধারণ লাইসেন্স জারি করে। তাতে আগামী বছরের ৭ এপ্রিল পর্যন্ত রাশিয়ার ডিজেল কেনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমানো ট্রাম্পের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যবৃদ্ধি এবং দৈনন্দিন খরচের বোঝা নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে তার মূল্য চোকাতে হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। ফলে রাশিয়ার সঙ্গে এই জ্বালানি সমঝোতাকে নিছক বাণিজ্যিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন না অনেকে।
নিজের সমাজমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, “রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে এইমাত্র অত্যন্ত সফল একটি আলোচনা শেষ করলাম।” তাঁর দাবি, রাশিয়া অবিলম্বে আমেরিকা ও বিশ্ববাজারে ৩ লক্ষ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। নভেম্বরে আসবে আরও ৫ লক্ষ টন, তার পরপরই আরও ১০ লক্ষ টন। এ ছাড়াও, রুশ ডিজেল শোধনাগারগুলির পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে অল্প সময়ের মধ্যে আরও ৩০ লক্ষ টন ডিজেল পাঠানো হতে পারে।
ট্রাম্পের আশা, এই ঘোষণার জেরে আমেরিকা-সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাজারে ডিজেলের দাম দ্রুত কমবে। কিন্তু সেই আশ্বাস ঘিরেই তৈরি হয়েছে প্রশ্ন—প্রস্তাবিত সরবরাহ কি সত্যিই বিশ্ববাজারে দামের উপর বড়সড় প্রভাব ফেলতে পারবে?
নিষেধাজ্ঞার নীতি কি বদলাচ্ছে?
রাশিয়ার সঙ্গে এই জ্বালানি চুক্তির ফলে ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট, ২০২৬’-এর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়েও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। গত মাসেই ওই আইনে সই করেছিলেন ট্রাম্প।
আইনটির ঘোষিত উদ্দেশ্য, রাশিয়ার জ্বালানি রফতানি থেকে আয় কমিয়ে আনা। সেই লক্ষ্যে আইন অনুযায়ী, এটি কার্যকর হওয়ার আগের ১২ মাসে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের সবচেয়ে বড় পাঁচ ক্রেতা দেশের পণ্যের উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রেসিডেন্টকে।
ভারত, চিন, আজারবাইজান, স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরি—এই পাঁচটি দেশ ওই শুল্কের আওতায় পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছিল। বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ আইন অনুযায়ী রুশ তেলের ক্রেতা দেশগুলির উপর ৩০ দিনের মধ্যে শুল্ক আরোপ করতে হবে। সেই সময়সীমা শেষ হচ্ছে ১৮ অক্টোবর।
তবে জাতীয় স্বার্থে কোনও দেশকে এই শুল্ক থেকে ছাড় দেওয়ার ক্ষমতাও প্রেসিডেন্টের হাতে রয়েছে। ফলে রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি জ্বালানি চুক্তির ঘোষণার পর প্রশ্ন উঠছে, এক দিকে মস্কোর কাছ থেকে ডিজেল কেনা আর অন্য দিকে রুশ জ্বালানির ক্রেতা দেশগুলির উপর শুল্ক চাপানো—দুই নীতি কি একই সঙ্গে চালিয়ে যাবে ওয়াশিংটন?
ভারতের তেল আমদানিতেও ধাক্কা
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল কমোডিটিজ অ্যাট সি-র তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে সমুদ্রপথে ভারতে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল রফতানি উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। অগস্টের তুলনায় এই রফতানি কমেছে ৫৯ শতাংশ। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের তুলনায় পতনের হার ৫১ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্য নিয়ে আমেরিকার অবস্থান এবং সম্ভাব্য শুল্কনীতি আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, লাভ কতটা?
রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তির ঘোষণায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কতটা কমবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বাজার বিশেষজ্ঞদের একাংশের। তেলের বাজারের গবেষক ররি জনস্টন এক্সে লিখেছেন, “আমেরিকা সদ্য রাশিয়ায় উৎপাদিত ডিজেলের উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। আর তার বিনিময়ে মস্কো ঠিক সেই একই নগণ্য পরিমাণ ডিজেল সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা তাদের ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা শোধনাগারগুলি নিয়েও তারা এখন রফতানি করতে পারছে।”
অর্থাৎ, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিনিময়ে রাশিয়ার কাছ থেকে যে পরিমাণ ডিজেল পাওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তা বাজারে বড়সড় পরিবর্তন আনার পক্ষে যথেষ্ট কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
জেলেনস্কির কড়া আপত্তি
এই ঘোষণায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও। এক্সে তিনি লেখেন, রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাত কমানোর কোনও সুস্পষ্ট ও স্থায়ী চুক্তি ছাড়া মস্কোর উপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা দুর্বলতার পরিচয়। তাঁর বক্তব্য, এতে রাশিয়াই লাভবান হবে—আরও মানুষকে হত্যা করার সুযোগ পাবে, দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালাতে পারবে এবং আমেরিকার প্রতি আরও কম গুরুত্ব দেবে। একই সঙ্গে, এর ফলে গোটা বিশ্বকেও আরও বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। এক দিকে আমেরিকার বাজারে জ্বালানির দাম কমিয়ে ভোটারদের স্বস্তি দেওয়া, অন্য দিকে রাশিয়ার উপর চাপ বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা। রুশ ডিজেলের এই চুক্তি শেষ পর্যন্ত কোন পথে এগোয়, তার উপরই নির্ভর করতে পারে ওয়াশিংটনের জ্বালানি ও নিষেধাজ্ঞা নীতির পরবর্তী পদক্ষেপ।