দু’বার প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশনেও মৃত্যু হয়নি, হাসপাতাল থেকে কারাগারে ফিরলেন ক্রিস্টা পাইক
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য দেওয়া হয়েছিল প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশনের দু’টি ডোজ। তাতেও মৃত্যু হয়নি। বরং ‘ব্রেন ডেড’ ঘোষণার পর উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটাচলাও করতে শুরু করেন তিনি! শেষ পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে ফের কারাগারে ফিরলেন আমেরিকার টেনেসির মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্রিস্টা পাইক। শনিবার তাঁর আইনজীবীরা এই খবর জানিয়েছেন। কী ভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ হল, তার উত্তর এখনও অধরা।
৫০ বছর বয়সি পাইককে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ডেবোরা কে জনসন পুনর্বাসন কেন্দ্রে। গত তিন দশক ধরে সেখানেই বন্দি তিনি। তাঁর আইনজীবী স্টিফেন ফেরেল, লুক ইনেন, র্যান্ডি স্পাইভি ও কেলি গ্লিসন এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, এই কঠিন সময়ে জরুরি সহায়তা দেওয়া ব্যক্তি এবং চিকিৎসকদের প্রতি কৃতজ্ঞ পাইক। কারাগারেও তাঁর চিকিৎসা চলছে। তাঁর শারীরিক অবস্থার উপর নজর রাখা হচ্ছে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর পেন্টোবারবিটাল নামের ওষুধের দু’টি ডোজ দিয়ে পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। ব্যর্থ সেই প্রচেষ্টার পর তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সোমবার তাঁকে ‘ব্রেন ডেড’ বা মস্তিষ্কের মৃত্যু হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
কিন্তু বৃহস্পতিবার পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। পাইকের আইনজীবী জানান, তিনি “উঠে হাঁটাচলা করছেন”। যদিও তখনও তাঁর কিছুটা ঘোরঘোর ভাব ছিল এবং হাত দু’টি ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারছিলেন না।
ইঞ্জেকশনেও কেন হল না মৃত্যু?
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় থেকেই অস্বাভাবিকতার ইঙ্গিত মিলেছিল। পাইক জানিয়েছিলেন, তাঁর হাত দু’টি জ্বালা করছে। এমন অনুভূতি হওয়ার কথা কি না, তা-ও জানতে চেয়েছিলেন তিনি। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কক্ষে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, “কিছুই স্বাভাবিক ছিল না।” যদিও কর্তৃপক্ষের দাবি, টেনেসিতে অনুমোদিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিধি মেনেই প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করা হয়েছিল।
তবে ঠিক কী কারণে দু’বার প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশন দিয়েও পাইকের মৃত্যু হল না, তার কোনও সরকারি ব্যাখ্যা এখনও সামনে আসেনি।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের অনুমান, ইঞ্জেকশনের ওষুধের কিছুটা বা অনেকটাই হয়তো শিরায় প্রবেশ না করে আশপাশের কলায় ছড়িয়ে পড়েছিল। তাঁর কোনও শিরা ফেটে গিয়ে থাকতে পারে। ওষুধে ত্রুটি থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আবার একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করে থাকতে পারে।
উল্লেখযোগ্য বিষয়, কয়েক মাস আগেই পাইকের আইনজীবীরা তাঁর শিরায় সমস্যার কথা তুলে ধরেছিলেন।
কেন মৃত্যুদণ্ড পেয়েছিলেন পাইক?
১৯৯৫ সালে নক্সভিল জব কর্পসের সহপাঠী ১৮ বছরের কলিন স্লেমারকে নির্যাতন ও খুনের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হন পাইক। আদালতের নথি অনুযায়ী, সেই সময় ১৯ বছরের পাইকের আশঙ্কা ছিল, স্লেমার তাঁর প্রেমিক টাডারিল শিপকে তাঁর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। শিপের বয়স তখন ১৭।
পাইক ও শিপ মিলে স্লেমারকে টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের একটি জঙ্গলঘেরা এলাকায় নিয়ে গিয়ে খুন করেন বলে আদালতে প্রমাণিত হয়। এই ঘটনায় পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। শিপের বয়স ১৮ বছরের কম থাকায় তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
পাইকের আইনজীবীদের দাবি, স্লেমার হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর বাইপোলার ডিসঅর্ডার এবং আঘাতজনিত মানসিক চাপের সমস্যা বা পোস্ট-ট্রম্যাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার ধরা পড়ে।
প্রাণভিক্ষার আবেদনে নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করে অনুশোচনাও প্রকাশ করেছিলেন পাইক। তিনি বলেছিলেন, “আমি যা করেছি, তার ভয়াবহতা বুঝতেই আমার বহু বছর লেগেছিল। কত মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করেছি, তা মেনে নিতে লেগেছিল আরও বেশি সময়। আমি কারও সন্তান, কারও বোন, কারও বন্ধুর জীবন কেড়ে নিয়েছি। এমন অপরাধ করার ক্ষমতা যে আমার ছিল, এখন সে কথা ভাবলেই নিজের প্রতি ঘৃণা হয়।”
মৃত্যুদণ্ড নিয়ে নতুন বিতর্ক
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থ চেষ্টা থেকে পাইকের বেঁচে ফেরার ঘটনায় আমেরিকা-সহ বিভিন্ন দেশে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডবিরোধী আন্দোলনেও নতুন করে গতি এসেছে। ঘটনার পর টেনেসির কারা প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিক পদত্যাগের কথা ঘোষণা করেছেন।
টেনেসির গভর্নর বিল লি বছরের বাকি সময়ের জন্য রাজ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত রেখেছেন। শুক্রবার ফ্লরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিসও তাঁর রাজ্যে নির্ধারিত একটি প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিকল্পনা বাতিল করেছেন।
তবে আমেরিকার অন্যত্র মৃত্যুদণ্ড কার্যকর বন্ধ হয়নি। বরং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি এবং তা সরাসরি সম্প্রচার করা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এ বার ফায়ারিং স্কোয়াড, সরাসরি সম্প্রচার?
বৃহস্পতিবার পেন্টাগন নিশ্চিত করেছে, টেক্সাসের ফোর্ট হুডে ১৩ জনকে হত্যার ঘটনায় দোষী প্রাক্তন সেনা মনোরোগ চিকিৎসক নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড ডিসেম্বরে ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া সরাসরি সম্প্রচারের কথাও জানানো হয়েছে। পরিকল্পনাটির নিন্দা করেছে রাষ্ট্রপুঞ্জ।
শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হাসানকে “নৃশংস” ও “হিংস্র” বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নিজেই নেবেন বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প।
তাঁর বক্তব্য, “এ নিয়ে দু’টি মত আছে—দেখানো হবে না, অথবা দেখানো হবে। কারণ, আপনারা জানেন, দেখালে হয়তো অন্যেরা সে যা করেছে, তা আর করবে না। তাই শেষ পর্যন্ত আমিই সিদ্ধান্ত নেব। সেনাবাহিনী কী করতে চাইছে, তা আমি জানি। তবে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।”
এক দিকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থ চেষ্টা, অন্য দিকে সেই প্রক্রিয়া সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা—পরপর এই ঘটনাগুলি আমেরিকায় মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতি, তার নির্ভরযোগ্যতা এবং নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো করেছে।