বলা হয়, যুদ্ধে প্রথম মৃত্যু হয় সত্যের। ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষেত্রে রাশিয়ার সঙ্গে শান্তির পথেও এখন সঙ্গী হয়েছে অবিশ্বাস্য সব মিথ্যাচার।

বুধবার সেন্ট পিটার্সবার্গে ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে বসে তেমনই এক বার্তা দিলেন স্টিভ উইটকফ। ইউক্রেনের দখল করা ভূখণ্ডের উপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণকে চুক্তির মাধ্যমে পাকাপোক্ত করাই তাঁর লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্যে হোয়াইট হাউসের কৌশল স্পষ্ট—কিয়েভের উপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করা, আর ক্রেমলিনকে মিষ্টি কথার তোষামোদে ভাসিয়ে দেওয়া।

“আপনি আমার প্রেসিডেন্ট, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে মানবদরদি বলে কত কথাই বলেন,” পুতিনকে বললেন উইটকফ। আবাসন ব্যবসার এই ধনকুবের ট্রাম্পের বন্ধু হওয়ার সুবাদে এখন আমেরিকার অন্যতম শীর্ষ দূত ও কূটনীতিক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের বৃহত্তম সংঘাতের অবসান ঘটানোর দায়িত্বও তাঁর কাঁধে। “আপনিও একজন মানবদরদি, স্যার। সে জন্য আপনাকে স্যালুট জানাই। আপনার প্রশংসা করি।”

পুতিনের ২৬ বছরের শাসনকালে তাঁকে এমন বিশেষণে ভূষিত করার নজির বিরল। যুদ্ধের ময়দানে রাশিয়ার অতীত কীর্তিকলাপের দিকে চোখ বোলালেই তা স্পষ্ট হবে। চেচনিয়া, জর্জিয়া ও সিরিয়ায় বোমাবর্ষণ, ভিন্নমত প্রকাশের জন্য হাজার হাজার রুশ নাগরিককে জেলে পোরা, বিরোধী শিবিরের বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনীতিকদের হিংসাত্মক মৃত্যু—এই দীর্ঘ ইতিহাসের মধ্যে পুতিনকে ‘মানবদরদি’ বলার মতো যোগ্যতা খুঁজে পাওয়া কঠিন। বিশেষ করে, হত্যা ও বিষপ্রয়োগের মতো ঘটনার দায় আড়াল করার অভিযোগ যখন বারবার উঠেছে।

ছবি: সেন্ট পিটার্সবার্গে ভ্লাদিমির পুতিন ও স্টিভ উইটকফের সাক্ষাৎ। ছবি: ক্রিস্টিনা সলোভিয়োভা/রয়টার্স।

ইউক্রেনের আকাশে অন্ধকারের ছক

এ সবের পরেও ইউক্রেনের প্রসঙ্গ বাকি। পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রাশিয়াই। সেই যুদ্ধে ইতিমধ্যেই প্রাণ গিয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষের। সম্প্রতি রাশিয়ার একটি কৌশলগত নথি হাতে পেয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। তাতে উঠে এসেছে, আসন্ন শীতে ইউক্রেনের শহরগুলিকে কী ভাবে অন্ধকারে ডুবিয়ে দিতে পারে ক্রেমলিন। কিয়েভ, ওডেসা ও খারকিভের মতো শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনার ইঙ্গিত রয়েছে তাতে। লক্ষ লক্ষ মানুষের বাস এই শহরগুলিতে। অর্থাৎ, ইচ্ছাকৃত ভাবে মানবিক বিপর্যয় তৈরি করার আশঙ্কা রয়েছে। ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরের বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি রাতে যে ভাবে হামলা চলছে, তাতে মনে হচ্ছে, কিয়েভ আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত এই কৌশল চালিয়ে যেতে পারে ক্রেমলিন।

বুধবার উইটকফ যখন পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করছেন, তখন খারকিভের স্কুলপড়ুয়ারা বিশেষ ভাবে মজবুত করা সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত নীচে নেমে যাচ্ছিল। মাথার উপর শাহেদ ড্রোনের হানার সতর্কবার্তা দিচ্ছিল সাইরেন। এটি কোনও সাধারণ বোমা-আশ্রয়কেন্দ্র নয়। রাশিয়ার সীমান্ত থেকে ২০ মাইলেরও কম দূরে অবস্থিত খারকিভে নিয়মিত বোমাবর্ষণের জেরে তৈরি হয়েছে এমন দশটি ভূগর্ভস্থ স্কুল। এটি তারই একটি।

শিক্ষকেরা জানালেন, স্কুলগুলি নিরাপদ হওয়ায় অভিভাবকেরা স্বস্তি পেয়েছেন। যে যুদ্ধ আরও বহু বছর চলতে পারে, এমনকি দুর্বল কোনও শান্তিচুক্তির পরেও ফের শুরু হয়ে যেতে পারে, তার মধ্যেও ছেলেমেয়েদের নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার একমাত্র উপায় এই ভূগর্ভস্থ শ্রেণিকক্ষ।

ছবি: খারকিভের একটি ভূগর্ভস্থ স্কুলের প্রবেশপথে পড়ুয়া ও অভিভাবকদের যাতায়াত। ছবি: পিট কিহার্ট/দ্য গার্ডিয়ান।

“আমরা সবাই ট্রাম্পকে বিশ্বাস করেছিলাম। ভেবেছিলাম, আমেরিকা এই দানব পুতিনকে থামাবে, ট্রাম্প থামাবেন—সত্যিই সেই আশা করেছিলাম আমরা,” বললেন খারকিভের নভোবাভারস্কি অঞ্চলের শিক্ষা বিভাগের প্রধান ওলেনা স্বিতলিচনা। বুধবার স্কুলের ক্যাফেতে বসে কথা বলছিলেন তিনি।

“আর এখন আমাদের মনে সন্দেহ। আমরা ওঁদের বিশ্বাস করি না। আমরা ভীষণ ভয় পাচ্ছি।”

শান্তির আলোচনার আড়ালে মৃত্যু

উইটকফ যখন পুতিনের সঙ্গে কথা বলছেন, তখন খারকিভের কাছে একটি পার্কে এ সপ্তাহের ড্রোন হামলায় নিহত ছয় জনের শেষকৃত্য করছিলেন তাঁদের পরিবারের সদস্যেরা। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিল এক বছরের শিশু আনহেলিনা। খেলার মাঠে নিজের স্ট্রলারে বেল্ট বাঁধা অবস্থায় বসে ছিল সে। তখনই হামলায় মৃত্যু হয় তার। প্রাণ হারান তার মা, স্থানীয় স্কুলশিক্ষিকা ইন্না মারিউখনাও। ওই হামলায় মোট চার জন প্রাপ্তবয়স্ক ও দুই শিশু—আনহেলিনা এবং ১১ বছরের আর এক বালিকার মৃত্যু হয়।

ছবি: মঙ্গলবারের বিমান হামলার পর খারকিভের একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন। ছবি: সের্গেই ববক/এএফপি/গেটি ইমেজেস।

এই প্রাণহানির প্রসঙ্গ হোয়াইট হাউসের বক্তব্যে প্রায় জায়গাই পায়নি। তাদের লক্ষ্য, যত দ্রুত সম্ভব ইউক্রেনকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা—সম্ভব হলে এই সপ্তাহেই। আর সবচেয়ে জরুরি, তা যেন ঘটে ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই। ওই নির্বাচনে গত দু’বছরে ট্রাম্পের নেতৃত্ব নিয়ে রায় দেবেন আমেরিকার ভোটাররা।

বোমা হামলার পর হোয়াইট হাউসের লনে সাংবাদিকদের সামনে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইউক্রেনের ব্যাপারে রাশিয়া “বেশ ঠিকঠাকই আচরণ করেছে”। সমালোচনার মুখে হামলাগুলির কথা পরে একবার উল্লেখ করলেও অসামরিক মানুষের উপর আক্রমণের গুরুত্ব খাটো করেছেন তিনি। মঙ্গলবার ওভাল অফিস থেকে তাঁর মন্তব্য, “কোনও একটা শহরে কিছু লোক হামলার শিকার হয়েছে বা ওই রকম কিছু, কিন্তু মারা গিয়েছে মূলত তরুণ সেনারাই।”

হোয়াইট হাউসের পক্ষে এমন মন্তব্যের রাজনৈতিক মূল্য চোকাতে হয়তো খুব বেশি কিছু নেই। উইটকফের রাশিয়া সফরের একটি লক্ষ্য ছিল সে দেশে আটক এক মার্কিন নাগরিককে ফিরিয়ে আনা—মিশিগানের ৭৪ বছরের এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে। কিন্তু ৩ নভেম্বরের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি আদায়ের আশায় পুতিনকে তোষামোদ করাই যদি উইটকফের কৌশল হয়, তা হলে সত্যের বিরুদ্ধে হোয়াইট হাউসের যুদ্ধে এ কেবল প্রথম গোলাবর্ষণ।