এইচ-১বি ভিসাধারীদের ‘চুক্তিবদ্ধ দাস’ বলার মন্তব্যে শব্দচয়নের খামতি স্বীকার করলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তবে নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করলেন না তিনি। ভ্যান্সের দাবি, তাঁর নিশানা বিদেশি কর্মীরা নন, বরং তাঁদের নিয়োগকর্তা এবং ভিসাব্যবস্থা। বিতর্কের মধ্যেই নিজের দক্ষিণ ভারতীয় শ্বশুর-শাশুড়ির প্রসঙ্গ টেনে তাঁদের প্রতি ভালবাসার কথাও জানালেন তিনি। এর আগে ভ্যান্সের মন্তব্যকে ‘অযৌক্তিক’ এবং ‘গভীরভাবে আপত্তিকর’ বলে নিন্দা করেছিল ভারত।

মার্কিন সময় শনিবার, ১৭ অক্টোবর, সিবিএস নিউজের একটি টাউন হল অনুষ্ঠানে ভ্যান্স বলেন, আমেরিকার অভিবাসনব্যবস্থায় ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। নিজের বক্তব্যের ভাষায় খামতি থাকতে পারে বলে স্বীকার করলেও বিতর্কিত মন্তব্যটি প্রত্যাহার করেননি তিনি। অনুষ্ঠানে স্ত্রী তথা আমেরিকার সেকেন্ড লেডি ঊষা ভ্যান্স এবং তাঁর দক্ষিণ ভারতীয় বাবা-মায়ের কথাও তোলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট।

অনুষ্ঠানে এক ভোটার ভ্যান্সের মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি জানান, পাঁচ বছর আগে আমেরিকায় এসেছিলেন, পরে নাগরিকত্ব পেয়েছেন এবং ভ্যান্সকে ভোটও দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, ভ্যান্স অভিবাসীদের ‘বলির পাঁঠা’ করছেন।

উত্তরে প্রথমেই নিজের পরিবারের প্রসঙ্গ তোলেন ভ্যান্স। বলেন, “আপনারা জানেন, আমার পরিবারের শিকড় কোথায়। আমার শ্বশুর ও শাশুড়ি দক্ষিণ ভারত থেকে এসেছিলেন। তাঁদের আমি ভালবাসি। আর অবশ্যই, তাঁদের মেয়ে আমেরিকায় জন্মেছেন এবং এখন এ দেশের সেকেন্ড লেডি। তাঁকে নিয়ে আমি অত্যন্ত গর্বিত, তাঁকে খুব ভালবাসি।”

১৮ অক্টোবর এক্সে প্রকাশিত সিবিএস নিউজের পোস্টে প্রশ্নকর্তার নাম জানানো হয় নিভ আগারাম। পোস্ট অনুযায়ী, প্রায় ২০ বছর আগে পরিবারের সঙ্গে আমেরিকায় এসেছিলেন তিনি। নাগরিকত্ব পাওয়ার পরে প্রথমবার ভোট দিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রশাসনের অভিবাসননীতি এবং অভিবাসীদের নিয়ে ভ্যান্সের বক্তব্য সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

জবাবে ভ্যান্স বলেন, কোনও মার্কিন নাগরিক যদি এমন মানুষদের সঙ্গে একই সমাজে থাকতে চান, যাঁদের সঙ্গে তাঁর কিছু মিল রয়েছে, তা হলে সেই চাওয়াকে তিনি অযৌক্তিক মনে করেন না। তাঁর মতে, অভিবাসনব্যবস্থার এমন পরিবেশ তৈরি করা উচিত।

ভ্যান্সের বক্তব্য, যাঁরা আমেরিকার অগ্রগতিতে অবদান রাখেন, তাঁদের স্বাগত জানানো হবে—এমন ব্যবস্থাই তিনি চান। তবে সেই ব্যবস্থা মার্কিন কর্মীদের প্রতিও ন্যায়সংগত হতে হবে। তাঁর কথায়, “আমাদের অভিবাসনব্যবস্থায় ভারসাম্য রাখতে হবে।”

‘দাসত্ব’ মন্তব্যের ব্যাখ্যা

বিতর্কিত মন্তব্য প্রত্যাহার না করে ভ্যান্স দাবি করেন, ‘চুক্তিবদ্ধ দাসত্ব’ কথাটি এইচ-১বি ভিসাধারী কর্মীদের উদ্দেশে বলা হয়নি; তাঁর সমালোচনার লক্ষ্য নিয়োগকর্তারা। তবে শব্দচয়ন আরও ভাল হতে পারত বলে স্বীকার করেন তিনি। বলেন, “এ ক্ষেত্রে আমার বক্তব্যের ভাষায় যতটা খামতি থেকে থাকে, তার দায় আমার।”

নিজের বক্তব্য ব্যাখ্যা করে ভ্যান্স বলেন, “আমি যখন চুক্তিবদ্ধ দাসত্বের কথা বলি, তখন সেটা এইচ-১বি ভিসাধারীদের সমালোচনা নয়। সেটা সেই সংস্থার সমালোচনা, যারা কাউকে বিদেশ থেকে নিয়ে আসে এবং কখনও কখনও একজন মার্কিন কর্মীকে ছাঁটাই করে। সেই ভিসাধারী কর্মী অভিযোগ করলে কিংবা বসের সঙ্গে মতের অমিল হলে চাকরি হারাতে পারেন… তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে।”

ভ্যান্সের মতে, এ ভাবে নিয়োগকর্তাদের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা চলে আসে। তাঁর অভিযোগ, ভিসার শর্তের কারণে চাকরি হারালে দেশে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে বিদেশি কর্মীদের। ফলে কর্মক্ষেত্রে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা বা নিয়োগকর্তার সঙ্গে মতবিরোধে জড়ানো তাঁদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁর সমালোচনা সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যা বিদেশি কর্মীদের ‘চুক্তিবদ্ধ দাসের’ মতো ব্যবহার করার সুযোগ দেয়।

উদাহরণ হিসেবে এক লক্ষ কোটি ডলার মূল্যের একটি সংস্থার কথা বলেন ভ্যান্স। তাঁর বক্তব্য, কোনও সংস্থা দাবি করতে পারে যে স্থানীয়ভাবে একজন হিসাবরক্ষক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, অথচ সেই সংস্থাই নিজের কর্মী তালিকায় থাকা একজন হিসাবরক্ষককে ছাঁটাই করছে। ভ্যান্সের কথায়, “এটা ন্যায্য নয়।”

কীভাবে শুরু বিতর্ক?

চলতি মাসের গোড়ায় এই বিতর্কের সূত্রপাত। একটি সাংবাদিক বৈঠকে ভ্যান্স এইচ-১বি ভিসাধারীদের ‘চুক্তিবদ্ধ দাস’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, বিদেশি আউটসোর্সিং সংস্থাগুলি কম বেতনে কর্মী নিয়োগ করে মার্কিন কর্মীদের মজুরি কমিয়ে দিচ্ছে।

ভ্যান্সের দাবি, একই কাজের জন্য একজন মার্কিন নাগরিকের তুলনায় এইচ-১বি ভিসাধারী কর্মী প্রায় ২০ হাজার ডলার কম বেতন পান। বিদেশি আউটসোর্সিং সংস্থার মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ করা হলে বেতনের এই ব্যবধান প্রায় ৪৮ হাজার ডলারে পৌঁছয় বলেও দাবি করেন তিনি। মার্কিন সংস্থাগুলিকে আরও বেশি করে আমেরিকান কর্মী নিয়োগ করতে এবং বিদেশ থেকে কম মজুরির শ্রমিক আনা বন্ধ করতে বলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট।

এর পরেই প্রশাসন বেশ কয়েকটি সংস্থাকে ‘পার্মানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন প্রোগ্রাম’ বা পার্ম কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ থেকে সাময়িকভাবে স্থগিত করে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়োগকর্তারা এইচ-১বি ভিসাধারী-সহ বিদেশি কর্মীদের গ্রিন কার্ডের জন্য স্পনসর করার প্রাথমিক ধাপ সম্পন্ন করতে পারেন। স্থগিতাদেশের আওতায় থাকা সংস্থাগুলির মধ্যে রয়েছে মাইক্রোসফট, কগনিজ্যান্ট, ইনফোসিস, টিসিএস, উইপ্রো, এইচসিএল এবং ক্যাপজেমিনি।

ভারতের কড়া প্রতিক্রিয়া

ভ্যান্সের মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানায়, আমেরিকায় কর্মরত ভারতীয় পেশাজীবীরা উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ এবং সে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ভ্যান্সের বক্তব্যে সেই বাস্তবতা উপেক্ষিত হয়েছে বলেও জানায় মন্ত্রক।

বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আসা অভিবাসীরাই আমেরিকার ইতিহাস গড়ে তুলেছেন। তাই বেদনাদায়ক ঐতিহাসিক ও ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের স্মৃতি জড়িয়ে থাকা এমন শব্দের ব্যবহার ‘গভীরভাবে আপত্তিকর’।

নয়াদিল্লির আরও বক্তব্য, টিসিএস ও ইনফোসিসের মতো ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার মাধ্যমে গ্রিন কার্ডের আবেদন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত করার সিদ্ধান্ত ভারত ও আমেরিকার অভিন্ন লক্ষ্যের পরিপন্থী। ইনফোসিস ও টিসিএসের পাশাপাশি এইচসিএলটেকও এই স্থগিতাদেশ নিয়ে বক্তব্য জানিয়েছে।