বাংলাস্ফিয়ার: এএনকে২ জিনের একটি বিশেষ রূপ নিষ্ক্রিয় করা চারটি বাঁদরকে সাত বছর পর্যবেক্ষণ করে মস্তিষ্ক, আচরণ ও বিপাকের পরিবর্তন নথিভুক্ত করেছেন চিনের গবেষকেরা। ৭ সেপ্টেম্বর রিসার্চ পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণায় দুটি রিসাস এবং দুটি সাইনোমলগাস বাঁদর ছিল। শৈশবে তাদের মধ্যে অটিজম-সদৃশ স্পষ্ট আচরণ দেখা যায়নি, যদিও মস্তিষ্কের আয়তন উল্লেখযোগ্য ভাবে কম ছিল। কৈশোর ও তরুণ বয়সে পৌঁছলে কয়েকটি নতুন সমস্যা প্রকাশ পেয়েছে।
এএনকে২ জিন থেকে অ্যাঙ্কাইরিন-বি প্রোটিনের দুটি প্রধান রূপ তৈরি হয়। তার মধ্যে ৪৪০ কিলোডালটনের বৃহৎ রূপটি প্রধানত স্নায়ুতন্ত্রে সক্রিয় এবং স্নায়ুকোষের দীর্ঘ প্রসার, সংযোগ ও বর্তনী স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখে। মানুষের কিছু নতুন এএনকে২ পরিবর্তনের সঙ্গে অটিজম ও বিস্তৃত স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যার পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক পাওয়া গেছে। সম্পর্কটির কার্যপ্রক্রিয়া বোঝার জন্য গবেষকেরা ক্রিসপার-ক্যাস৯ দিয়ে বাঁদরগুলির ওই বৃহৎ রূপটি নিষ্ক্রিয় করেছিলেন।
নতুন পর্যবেক্ষণে জিন-সম্পাদিত বাঁদরগুলি নিয়ন্ত্রণ-দলের তুলনায় বেশি চলাফেরা করেছে। স্থানিক বিলম্বিত-প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা, কর্মস্মৃতি, পরিস্থিতি অনুযায়ী নিয়ম বদল এবং পুরস্কারের জন্য চাপদণ্ড ব্যবহারের শিক্ষায় ঘাটতি দেখা গেছে। আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক যোগাযোগের কয়েকটি পরিমাপেও পার্থক্য পাওয়া যায়। চারটি সমন্বিত ক্যামেরা দিয়ে চলাফেরার ৪৬টি বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়েছিল, যাতে কেবল মানুষের চোখের পর্যবেক্ষণের উপর নির্ভর করতে না হয়।
মস্তিষ্কের গঠনগত পরিবর্তন বয়স বাড়ার পরেও বজায় ছিল। কার্যকরী মস্তিষ্ক-চিত্রে কিছু বর্তনীর যোগাযোগে অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। গবেষকেরা মস্তিষ্কে ট্রাইগ্লিসারাইড ও গ্লিসারোফসফোলিপিড বৃদ্ধির পাশাপাশি রক্তের জিন-সক্রিয়তার তথ্যে রোগপ্রতিরোধব্যবস্থার বিশৃঙ্খলার চিহ্ন পেয়েছেন। তবে বিপাক বা রক্তের পরিবর্তন আচরণগত সমস্যার কারণ—এমন সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায়নি; গবেষণাপত্রে সেগুলিকে সম্ভাব্য সম্পর্ক হিসেবেই রাখা হয়েছে।
২০২১ সালে প্রকাশিত প্রথম পর্যায়ের ফলের সঙ্গে বর্তমান ফলের পার্থক্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তখন দুই বছর বয়স পর্যন্ত বাঁদরগুলির সামাজিক আচরণ, ঘুম বা চলাফেরায় বড় পরিবর্তন ধরা পড়েনি। মানুষের বহু স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যা কৈশোরে নতুন ভাবে প্রকাশ পায় বা জটিল হয়। বাঁদরের তুলনামূলক দীর্ঘ কৈশোর পর্যবেক্ষণ তাই ইঁদুরের অতি দ্রুত জীবনচক্রে অধরা কিছু পরিবর্তন ধরতে পারে।
বিশ্লেষণ: শিরোনামে ‘অটিজমের বাঁদর’ বলা বৈজ্ঞানিক ও মানবিক—দুই দিক থেকেই ভুল। অটিজম কোনও একটি আচরণ বা একক জিনের ফল নয়। মানুষের ক্ষেত্রে জিন, বিকাশ ও পরিবেশের বহু স্তর জড়িত। চারটি প্রাণীর নির্দিষ্ট জিন-রূপ নিষ্ক্রিয় করে কয়েকটি সাদৃশ্য পাওয়া মানে মানুষের অটিজম পুনর্নির্মাণ নয়। গবেষকেরাও ‘স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যার কিছু বৈশিষ্ট্যের প্রতিরূপ’ কথাটি ব্যবহার করেছেন।
সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা নমুনার আয়তন। দুটি করে দুই প্রজাতির পরিবর্তিত প্রাণী থেকে প্রজাতিগত পার্থক্য, লিঙ্গ, ব্যক্তিত্ব বা সম্পাদনার অনিচ্ছাকৃত প্রভাব নির্ভরযোগ্য ভাবে আলাদা করা কঠিন। লেখকেরা বড় দলে যাচাইয়ের প্রয়োজন স্বীকার করেছেন। মানুষ-ঘনিষ্ঠ প্রাণী ব্যবহারের নৈতিক মূল্যও খুব বেশি; ভবিষ্যৎ পরীক্ষা চিকিৎসাগত লাভের স্পষ্ট সম্ভাবনা ও কঠোর প্রাণিকল্যাণ-পর্যালোচনা ছাড়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
গবেষণাটি কোনও রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসা দেয়নি। তার মূল্য দীর্ঘ পর্যবেক্ষণে—শৈশবে আচরণ স্বাভাবিক দেখালেও মস্তিষ্কের প্রাথমিক পরিবর্তন কৈশোরে কী ভাবে জটিল সমস্যা হয়ে উঠতে পারে, সেই প্রশ্নটি তুলেছে। উত্তর এখনও প্রাথমিক, কিন্তু সময়কে পরীক্ষার একটি স্বাধীন উপাদান হিসেবে দেখানোর জন্য কাজটি গুরুত্বপূর্ণ।