বাংলাস্ফিয়ার: উৎসবের মরশুম কাটতে না কাটতেই রাজ্য রাজনীতিতে বেজে উঠেছে পুরসভা নির্বাচনের দামামা। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রস্তুতি জোরদার করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP)। দলের অন্দরে সাংগঠনিক শক্তি যাচাই এবং বুথভিত্তিক রণকৌশল চূড়ান্ত করতে সম্প্রতি এক মেগা বৈঠক সেরেছে রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব। আসন্ন পুরসভা নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দল এবার কোনো পরীক্ষামূলক বা হঠকারী পদক্ষেপে হাঁটতে নারাজ। প্রার্থী নির্বাচনের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে 'ভূমিপুত্র' হওয়া, স্বচ্ছ ভাবমূর্তি এবং জনসংযোগকে সর্বাগ্রে রাখা হচ্ছে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। একইসঙ্গে অন্য কোনো দলের সঙ্গে জোট জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে সমস্ত আসনেই নিজেদের শক্তিতে লড়াইয়ের বার্তা দিয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা সুকান্ত মজুমদার।

রাজনৈতিক মহল সূত্রে খবর, আসন্ন পুরভোটের জন্য দলের পক্ষ থেকে একটি নির্দিষ্ট রূপরেখা বা তিন ধাপের ‘সিলেবাস’ তৈরি করা হয়েছে। বিগত বিভিন্ন নির্বাচনে সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং বুথ স্তরের পর্যালোচনার ভিত্তিতে এবার প্রার্থী বাছাইয়ে কঠোর নজরদারি রাখছে রাজ্য নেতৃত্ব। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে মূল শর্তগুলির মধ্যে রয়েছে—সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে অবশ্যই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা বা ‘ভূমিপুত্র’ হতে হবে, যাঁর এলাকায় স্বচ্ছ ভাবমূর্তি এবং জনগণের সঙ্গে গভীর যোগাযোগ রয়েছে। এছাড়া নিচুতলার দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও পরিশ্রমী কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সমাজে নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নামও বিবেচনা করা হচ্ছে।

প্রার্থী তালিকা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে চলা বিভিন্ন জল্পনা ও শাসকশিবিরের সমালোচনার জবাবে এদিন বেশ আক্রমণাত্মক মেজাজে দেখা যায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারকে। তিনি বলেন, "২০৯টি ওয়ার্ডের শুধু নয়। যিনি বলছেন তিনি যদি চান, আর আমরা যদি চাই ওনার (মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) বাড়ি থেকেও কাউকে আমরা প্রার্থী করে দিতে পারি। কিন্তু করব না।" তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে বঙ্গ রাজনীতির অন্দরে নতুন করে তীব্র শোরগোল শুরু হয়েছে।

বিজেপির পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, প্রার্থী নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং সাধারণ কর্মীদের নাগালের মধ্যে রাখতে দলের নির্বাচনী কার্যালয়গুলিতে একটি বিশেষ ‘ড্রপ বক্স’ বা বাক্স রাখা হয়েছিল। সেখানে প্রার্থীরা নিজেদের বায়োডাটা বা আবেদন জমা দিয়েছেন। প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে একাধিক যোগ্য প্রার্থীর আবেদন জমা পড়ায় এবং প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হওয়ায় নেতৃত্ব বেশ স্বস্তিতে রয়েছে। দলের দাবি, কলকাতা পুরসভার প্রতিটি আসনের জন্যই একাধিক যোগ্য মুখ পাওয়া গেছে।

কেন্দ্রীয় স্তরে জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চা (NDA) জোটে শরিক থাকলেও রাজ্য স্তরের নির্বাচনে অন্য কোনো দলের সঙ্গে জোট বাঁধার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন সুকান্ত মজুমদার। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, আসন্ন নির্বাচনে অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের দিকে তাকিয়ে না থেকে রাজ্যের সমস্ত আসনেই একা নিজেদের প্রতীক চিহ্ন ও সাংগঠনিক শক্তিতে লড়াই করার পূর্ণ প্রস্তুতি নিচ্ছে বিজেপি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত বিধানসভা বা অন্যান্য উপনির্বাচনের ফলাফল থেকে শিক্ষা নিয়ে তৃণমূল স্তরের ক্ষোভ প্রশমিত করতে এবং স্বচ্ছ ভাবমূর্তির মুখ তুলে ধরতে এবার অনেক বেশি সতর্ক বিজেপি নেতৃত্ব। তবে ‘ভূমিপুত্র’ নীতি এবং দলীয় কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার এই ফর্মুলা শেষ পর্যন্ত ভোটের ময়দানে কতটা কার্যকরী হয় এবং শাসকদলের বিরুদ্ধে কতটা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। পুরভোটের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলির এই প্রস্তুতি ও তরজা যে আগামী দিনে আরও তীব্র আকার ধারণ করবে, তা বলাই বাহুল্য।