বাংলাস্ফিয়ারঃ তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়েছিলেন। সেখানে শিখেছিলেন কী ভাবে আরও বেশি সাফল্য অর্জন করতে হয়, আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে উঠতে হয়। তার পর নিউ ইয়র্ক টাইমসে সহকারীর চাকরি পান। ধাপে ধাপে উঠে হয়ে ওঠেন মতামত বিভাগের লেখক ও প্রযোজক। সপ্তাহান্তে ক্রাউস ম্যারাথন দৌড়তেন, অংশ নিতেন দীর্ঘ সময় ধরে শারীরিক সহনশীলতার পরীক্ষা নেয় এমন সব খেলাধুলোয়। তিরিশের কোঠায় থাকাকালীন বারবার নিজের আগের সেরা রেকর্ড ভেঙেছেন।
এখন জুমে কথা বলতে গিয়ে তিনি বললেন, “আমার গোটা জীবন আসলে একটিমাত্র প্রশ্নকে ঘিরেই চলত: কী ভাবে আরও বেশি পরিশ্রম করতে পারি, আরও বেশি কাজ করতে পারি?”
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই মানসিকতাই উল্টো ফল দিতে শুরু করে। দুই সন্তানের জন্মের পর ক্রাউস দেখলেন, তিনি পিছিয়ে পড়ছেন, সব দায়িত্ব ঠিকমতো সামলাতে পারছেন না। দৌড়নো আর লেখালিখির প্রতি তাঁর আগ্রহও হারিয়ে যাচ্ছে। কিছু একটা বদলানো দরকার ছিল।
ক্রাউসের মতো আমাদের অনেককেই শেখানো হয়, হাল ছেড়ো না, লেগে থাকো। তাঁর নতুন বই দ্য কেস ফর কুইটিং: দ্য সারপ্রাইজিং বেনিফিটস অব অপ্টিং আউট—বাংলায় বলা যায়, ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে: সরে আসার অপ্রত্যাশিত সুফল—এ তিনি কখনও হাল না ছাড়ার মূল্য ও ফাঁদগুলি খতিয়ে দেখেছেন। জানিয়েছেন, কী ভাবে নিজেকে সেখান থেকে মুক্ত করেছেন।
লিন্ডসে ক্রাউসের বই ‘দ্য কেস ফর কুইটিং: দ্য সারপ্রাইজিং বেনিফিটস অব অপ্টিং আউট’।
ক্রাউস এখন মনে করেন, তৃপ্তিদায়ক ও সফল জীবনের জন্য ছেড়ে দেওয়াও অপরিহার্য। তিনি নিজেই তাঁর মর্যাদাপূর্ণ চাকরি ছেড়েছেন, পা বাড়িয়েছেন এমন এক পথে যার ঝুঁকি ও প্রাপ্তি—দুই-ই ছিল অজানা।
তিনি বললেন, “ছেড়ে দেওয়াকে অধ্যবসায়ের শত্রু হিসেবে না দেখে, অধ্যবসায়েরই একটি উপায় হিসেবে দেখতে শিখতে হবে আমাদের। অনেক সময়ে আমরা কোনও গর্তে পড়ে গেলে আরও জোরে মাটি খুঁড়তে থাকি। অথচ তখন আমাদের খোঁড়া বন্ধ করাই উচিত।”
ছেড়ে দেওয়া সম্পর্কে আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা কী?
সেই মুহূর্তে ছেড়ে না দেওয়াটাকে কোনও কোনও দিক থেকে বীরত্ব বলে মনে হয়। যেন নিজের সামর্থ্য বা মনের জোর প্রমাণ করতে আপনি আত্মবলিদান দিচ্ছেন। বাস্তবে কিন্তু আপনি নিজেকেই সীমাবদ্ধ করে ফেলছেন। কারণ যে কাজগুলি ফল দিচ্ছে না, সেগুলি থেকে সরে আসছেন না।
দীর্ঘ মেয়াদে নিজেদের সেরাটা দিতে চাইলে, আমাদের আরও ভাল ভাবে ছেড়ে দিতে শিখতে হবে। সেটা পথ বদলানো হতে পারে, কিংবা কিছু দিনের বিরতি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আমাদের আরও ভাল করতে, আরও দূর এগোতে সাহায্য করতে পারে বলেই আমার মনে হয়।
ছেড়ে দেওয়ার অর্থ অনিশ্চয়তাকে মেনে নেওয়া, অনেক সময়ে ঝুঁকিও নেওয়া। কিন্তু শুধু সে দিকে তাকিয়ে থাকলে আমরা নিজেদের এই প্রশ্নটাই করি না: কাজটা ভালবাসি বলে চালিয়ে যাচ্ছি, নাকি থেমে গেলে কী হতে পারে, তার মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছি বলে?
ছেড়ে দেওয়ার মধ্যে দিয়ে আমরা কী পেতে পারি?
আসল বিষয় হল অগ্রাধিকার। সব কিছুর প্রতি দায়বদ্ধ হতে গেলে, কোনও কিছুর প্রতিই যথার্থ দায়বদ্ধ থাকা যায় না।
এই বইয়ের অনেকটাই আসলে নিজের সঙ্গে আমার কথোপকথন। আমি সত্যিই ভাবতাম, সব কিছুতে হ্যাঁ বলাটা দারুণ ব্যাপার। মনে হত, “বাহ্, দেখো, তুমি কত কিছু করতে পারো!”
কিন্তু লিখতে গিয়ে বুঝলাম, এই মনোভাবের মধ্যে যতটা সংকীর্ণতা, এমনকি ভীরুতাও ছিল, ততটা আমি স্বীকার করতে রাজি ছিলাম না।
সব কিছুতে হ্যাঁ বলার অর্থ, যা সত্যিই জরুরি, তাকে না বলা। যে বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ নয়, সেগুলি ছেড়ে দিলে অর্থপূর্ণ বিষয়গুলির প্রতি আমরা আরও গভীর ভাবে দায়বদ্ধ হতে পারি। সেগুলিকে কেন্দ্র করেই নিজেদের জীবন গড়ে তুলতে পারি।
কোনও লক্ষ্যের দিকে এগোতে গিয়ে কখনও বাধার মুখে পড়তে হয়। কখন ছেড়ে দেব, আর কখন বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাব—সেটা বুঝব কী ভাবে?
আমি কাউকে সংগ্রাম এড়িয়ে চলতে বা প্রতিকূলতা সামলানোর ক্ষমতা গড়ে না তুলতে বলছি না। এই বই তাঁদের জন্য, যাঁরা সহ্য করতে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন যে, তার জন্য কী মূল্য দিতে হচ্ছে, সেটাই আর বুঝতে পারেন না। যেন তাঁরা লেগে থাকার ক্ষমতাকেই লেগে থাকার বাধ্যবাধকতা বলে ভুল করেছেন।
আমি “ছেড়ে দেওয়ার বিবেচনাবোধ” নিয়ে কথা বলেছি। অর্থাৎ সাময়িক বাধা আর এমন এক প্রচেষ্টার মধ্যে তফাত করতে শেখা, যার গোড়াতেই রয়েছে নিষ্ফলতা। চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা আমরা কী ভাবে ভাবছি? তার পক্ষে যুক্তি খাড়া করছি? ইতিমধ্যে সময়, শ্রম বা অর্থ ঢেলেছি বলে, যে করেই হোক সেখান থেকে কিছু উদ্ধার করতে মরিয়া হয়ে উঠছি? এ ভাবে কি নিজেরই ক্ষতি করার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?
দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের ক্ষেত্রে অগ্রগতির কথা ভাবতে পারি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কি আমরা যা চাই, তার কাছে পৌঁছচ্ছি, নাকি আরও দূরে সরে যাচ্ছি? আমাদের কঠোর পরিশ্রম কি ফলপ্রসূ হচ্ছে, নাকি তা অর্থহীন? ছেড়ে দেওয়ার সময় এসেছে, না কি আরও সময় ও শ্রম দেওয়া উচিত—এই দু’টি প্রশ্ন তা বুঝতে সাহায্য করে।
আরও বেশি পরিশ্রম করার পরেও, কিংবা পদ্ধতি বদলানোর পরেও যদি কাঙ্ক্ষিত ফল না পান, তা হলে হয়তো আপনি ভুল ক্ষেত্রে লড়ছেন। আপনার চেষ্টা অন্য কোথাও আরও ভাল কাজে লাগতে পারে।
আপনি যা করছেন, তা যদি উপভোগ করেন, সেটাই যথেষ্ট মূল্যবান। কিন্তু কাজটা এগোচ্ছে না বলে যদি হতাশ হন, তা হলে থেমে গিয়ে অন্য কিছু করতেই পারেন। কথাটা খুব স্বাভাবিক শোনায়। অথচ আমার মনে হয়, কখনও কখনও আমরা নিজেদের বোঝাই যে, সেই সুযোগ আমাদের নেই।
মনের গভীরে জানি, ছেড়ে দিলেই ভাল থাকব—তার পরেও কিছু বিষয় আঁকড়ে পড়ে থাকি কেন?
আমরা খুব সহজাত কিছু সংকেত উপেক্ষা করতে শিখেছি। হাওয়ার্ড হিউজেস মেডিক্যাল ইনস্টিটিউটে জেব্রাফিশ নিয়ে হওয়া একটি গবেষণার কথা লিখতে গিয়ে বুঝলাম, আমিও তা-ই করেছি।
জেব্রাফিশ যখন প্রথম প্রবল স্রোতের মুখে পড়ে, তখন তারা হঠাৎ অনেক বেশি শক্তি দিয়ে চেষ্টা করে। কিন্তু তাতেও কাজ না হলে চেষ্টা ছেড়ে দেয়। কখন আর চেষ্টা করে লাভ নেই, তা নির্ধারণ করে তাদের মস্তিষ্কের কিছু বিশেষ কোষ। বিজ্ঞানীরা সেগুলিকে বলেন “ফিউটিলিটি কাউন্টার”—নিষ্ফলতার হিসাবরক্ষক।
জেব্রাফিশ এই সংকেত মানতে জানে, কারণ তার বেঁচে থাকার সঙ্গে বিষয়টি জড়িত। কিন্তু মানুষ এই সংকেত অগ্রাহ্য করতে শিখেছে।
এর অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের ধারণার সঙ্গে যুক্ত। আমরা যখন কোনও কিছু প্রবল ভাবে চাই, তখন নিজেদের বোঝাই যে, কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তা অর্জন করার ক্ষমতা আমাদের আছে। কিন্তু কখনও কখনও আসলে আমরা প্রচেষ্টার নিষ্ফলতাকেই অস্বীকার করছি।
যে ছেড়ে দেয়, তাকে আমরা ব্যর্থ মানুষ বলে ধরে নিই। অথচ অনেক সময়ে বুঝতেই পারি না যে, ব্যর্থতা ইতিমধ্যেই ঘটে গিয়েছে। আমরা শুধু তার পিছনে আরও ঢালতে থাকি। যে লড়াই আর জেতার নয়, তাতেই আরও বিনিয়োগ করি। আর সেটাই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
ছেড়ে দেওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে আপনি বহু মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। তাঁদের কারও কথা কি আপনার ভাবনা বদলে দিয়েছে?
আমি এমন এক মহিলার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম, যিনি বারবার আইভিএফ চিকিৎসার মধ্যে দিয়ে গিয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। জীবন থেকে তিনি যা চেয়েছিলেন, তার কেন্দ্রে ছিল সন্তানের জন্ম দেওয়া। সেই লক্ষ্যে তিনি গোটা একটি দশক উৎসর্গ করেছিলেন।
এই একটি লক্ষ্য পূরণের জন্য জীবনের কত সুন্দর সম্ভাবনাকে তিনি স্থগিত রেখেছিলেন। অথচ লক্ষ্যটি কিছুতেই পূরণ হচ্ছিল না। উল্টে গোটা ব্যাপারটা তাঁকে অসুখী করে তুলছিল।
শেষ পর্যন্ত তিনি আইভিএফ ছেড়ে দিয়ে জীবনের পথে এগিয়ে যান। এক-দু’বছর পরে তথ্য যাচাইয়ের জন্য যখন আবার তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করি, তত দিনে তাঁর একটি সন্তান হয়েছে। একচল্লিশ বছর বয়সে তিনি স্বাভাবিক ভাবে গর্ভধারণ করেছিলেন। কী ভাবে এমন হল, তিনি নিজেই জানতেন না।
এটা কেবল আরও এক বার স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, শুরু থেকেই বিষয়টি তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল না।