বাংলাস্ফিয়ার: জম্মু ও কাশ্মীরের উপত্যকা থেকে শুরু করে দিল্লির জাতীয় রাজনীতির আঙিনা—পুরোটাই এখন নতুন করে উত্তপ্ত ন্যাশনাল কনফারেন্স (NC) সুপ্রিমো তথা রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লার এক বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি কাশ্মীর ও প্রতিবেশী পাকিস্তান সম্পর্কিত এক স্পর্শকাতর রাজনৈতিক বয়ান দেওয়ার পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP)। দেশের সার্বভৌমত্ব, সুরক্ষা এবং সংহতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পাকিস্তান-বান্ধব কথা বলার অভিযোগে ফারুক আবদুল্লার বিরুদ্ধে চরম আক্রমণের পাশাপাশি তাঁর কাছ থেকে অবিলম্বে জনসমক্ষে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার জোরালো দাবি তুলেছে গেরুয়া শিবির।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অশান্ত কাশ্মীর উপত্যকায় ধারা ৩৭০ বিলোপের পর শান্তি প্রতিষ্ঠার যে প্রক্রিয়া চলছে, ফারুক আবদুল্লার সাম্প্রতিক মন্তব্য যেন তা নিয়েই নতুন সংঘাতের সূত্রপাত করল। বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বের অভিযোগ, রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং ভোটে ফায়দা লুটতে প্রবীণ এই নেতা এমন একটি সময় এই ধরনের স্পর্শকাতর মন্তব্য করলেন, যখন জম্মু ও কাশ্মীর এক ঐতিহাসিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র ও শীর্ষ নেতাদের দাবি, ভারত যখন বিশ্বমঞ্চে বারবার প্রমাণ করেছে যে সীমান্তপারের পাকিস্তানই কাশ্মীর উপত্যকায় সন্ত্রাসবাদ, রক্তপাত এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী উসকানির মূল উৎস, ঠিক সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে এক সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর মুখ থেকে এমন উক্তি আসা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। বিজেপির অভিযোগ, ফারুকের বক্তব্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইসলামাবাদের সন্ত্রাসবাদী বয়ানকেই সমর্থন জানায়। ভারতের সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনী যখন নিজেদের জীবন বাজি রেখে সীমান্ত রক্ষা করছে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, তখন ফারুকের এই সুর শত্রুদেশকে অতিরিক্ত সুবিধা ও বাড়তি অক্সিজেন জোগাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফারুক আবদুল্লার এ ধরনের বিতর্কিত মন্তব্য অবশ্য নতুন কিছু নয়। অতীতেও পাক অধিকৃত কাশ্মীর (PoK) ভারতের অংশ নাকি পাকিস্তানের, কিংবা পাকিস্তানের সঙ্গে ইসলামাবাদের শর্তেই আলোচনা চালানো উচিত কি না—তা নিয়ে একাধিকবার বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন তিনি। তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে, যেখানে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক স্তরে ক্রমেই কোণঠাসা এবং ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী জিরো টলারেন্স নীতি গোটা বিশ্বে সমাদৃত, সেখানে ন্যাশনাল কনফারেন্স প্রধানের এই বক্তব্যকে কেবল একটি ‘সাধারণ রাজনৈতিক মন্তব্য’ বলে মেনে নিতে রাজি নয় বিজেপি।
এই প্রসঙ্গে বিজেপির একাধিক সর্বভারতীয় নেতা এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ উগরে দিয়ে জানান, "ফারুক আবদুল্লা ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে, ভারতের সংবিধানে প্রদত্ত পদ ভোগ করে যেভাবে প্রতিবেশী শত্রুর সুরে সুর মিলিয়ে কথা বলছেন, তা কেবল দায়িত্বজ্ঞানহীনতাই নয়, বরং এক প্রকার রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। জম্মু ও কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ আজ উন্নয়ন ও শান্তির মূলধারায় ফিরতে চান। তাঁরা আর কোনোদিন উপত্যকাকে পাথর ছোঁড়ার আখড়া বা উপদলীয় রাজনীতির বলি হতে দেবেন না।"
বিজেপির এই কড়া অবস্থানের জবাবে এখনও পর্যন্ত ন্যাশনাল কনফারেন্স কিংবা ফারুকের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তবে উপত্যকার শাসক ও বিরোধী দলগুলির মধ্যে এই নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন টানাপোড়েন। অনেক নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক মনে করছেন, ফারুকের বক্তব্য হয়তো জম্মু ও কাশ্মীরের আঞ্চলিক স্বাধিকার ও পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার পুরোনো রূপরেখা কেন্দ্রিক ছিল, কিন্তু আন্তর্জাতিক ও জাতীয় স্তরে পাকিস্তানকে ঘিরে ভারতের বর্তমান কঠোর অবস্থানের সামনে তা চূড়ান্তভাবে বিপরীত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
এই ইস্যুতে ফারুকের বিবৃতি প্রত্যাহার এবং প্রকাশ্যে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য ক্রমশ চাপ বাড়াচ্ছে বিজেপি। একইসঙ্গে কেন্দ্র সরকারের নীতি ও সুরক্ষার স্বার্থ বজায় রেখে কঠোর প্রশাসনিক নজরদারির দাবিও তোলা হয়েছে। উপত্যকায় সাম্প্রতিককালে জঙ্গি তৎপরতা ঠেকানো এবং পর্যটন ও বাণিজ্যের যে গতি এসেছে, ফারুকের মতো প্রবীণ নেতার দায়িত্বহীন মন্তব্যে তাতে কোনো ছেদ পড়ে কি না, এখন সেটাই দেখার।
