বাংলাস্ফিয়ার : কলকাতায় নিজের বাড়িতে হামলার জন্য ‘হিন্দুত্ববাদী দুষ্কৃতীদের’ দায়ী করে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেছিলেন সিপিএম নেতা ও প্রবীণ আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। সেই পোস্ট থেকে সংশ্লিষ্ট শব্দ সরাতে তাঁকে ২৪ ঘণ্টা সময় দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার মুখ্যমন্ত্রী জানান, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পোস্ট সংশোধন না করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যেই বিকাশরঞ্জনের বিরুদ্ধে দু’টি এফআইআর দায়ের করেছে পুলিশ। অন্যদিকে, তাঁর বাড়িতে হামলার ঘটনায় একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

শুক্রবার রাজ্য সচিবালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শুভেন্দু বলেন, বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে, তাই গোটা পোস্ট মুছে ফেলার কথা তিনি বলছেন না। তাঁর আপত্তি ‘হিন্দুত্ববাদী’ শব্দের ব্যবহারে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, এই মন্তব্যে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের বিশ্বাস ও অনুভূতিতে আঘাত করা হয়েছে। বিকাশরঞ্জন পোস্ট সংশোধন না করলে সংশ্লিষ্ট সমাজমাধ্যম কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সেটি সরানোর উদ্যোগ নিতে কলকাতা পুলিশকে বলা হবে বলেও জানান তিনি।

মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, হামলার খবর পেয়ে তিনি পুলিশ কমিশনারকে অভিযুক্তকে চিহ্নিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বিকাশরঞ্জন অভিযোগ জানান বা না জানান, ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে অ্যাডভোকেট জেনারেল সুরজিৎ মিত্রকেও অনুরোধ করেছিলেন বলে জানান শুভেন্দু। সরকারের তরফে এমন হিংসা সমর্থন করা হয় না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ভোর পাঁচটা নাগাদ। ই এম বাইপাসের কাছে কালিকাপুরে বিকাশরঞ্জনের বাড়ি লক্ষ্য করে মদের বোতল ছোড়া হয় বলে অভিযোগ। তাঁর বক্তব্য, মোটরবাইকে আসা মুখঢাকা হামলাকারীরা জানলার কাচ ভেঙে পালিয়ে যায়। বাড়ির এক পরিচারক অল্পের জন্য আঘাত থেকে রক্ষা পান। একটি সিসিটিভি ক্যামেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

বিকাশরঞ্জনের দাবি, মোটরবাইকের নম্বরপ্লেট ঢাকা ছিল। সেই কারণেই ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হামলা বলে মনে করছেন তিনি। সমাজমাধ্যমে নিজের অবস্থান জানিয়ে প্রাক্তন সাংসদ ও কলকাতার প্রাক্তন মেয়র বলেন, এভাবে তাঁকে ভয় দেখানো যাবে না। আত্মরক্ষার জন্য আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স চেয়ে আবেদন করার কথাও জানান তিনি। হামলার বিষয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন এই সিপিএম নেতা।

পুলিশ জানিয়েছে, হামলার ঘটনায় নরেন্দ্রপুরের বাসিন্দা বাপ্পা গুছাইতকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কেন হামলা চালানো হয়েছিল এবং অন্য কেউ জড়িত কি না, তা জানতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ধৃতের গলায় তৃণমূলের উত্তরীয় থাকা একটি ছবি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়েছে। শুভেন্দু তাঁকে তৃণমূলকর্মী বলে দাবি করেছেন। তবে পুলিশের বক্তব্য, তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় এবং হামলার উদ্দেশ্য যাচাই করা হচ্ছে। ফলে দলীয় যোগসূত্র সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ও তদন্তের অবস্থান এক নয়। ধৃতের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিপন্ন করা ও ভয় দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। পরে প্রমাণ লোপাট ও জালিয়াতির অভিযোগও যোগ হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

এর পাশাপাশি বিকাশরঞ্জনের পোস্ট ঘিরেও পৃথক আইনি পদক্ষেপ হয়েছে। পুলিশের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, তাঁর মন্তব্যের জন্য টপসিয়া ও গরফা থানায় দু’টি এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। একটি দক্ষিণপন্থী সংগঠনের অভিযোগের ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজেও পোস্টের বিষয়ে এফআইআর করার নির্দেশ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

আর জি কর মেডিক্যাল কলেজে এবিভিপির মেডিভিশন সম্মেলনেও বিষয়টি নিয়ে সরব হন শুভেন্দু। তাঁর যুক্তি, ঘটনার প্রকৃত তথ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে হিন্দুত্ববাদীদের দায়ী করে মন্তব্য করা হিন্দু সম্প্রদায়কে অপমান করার শামিল। হামলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সমাজমাধ্যমের বক্তব্যের জন্যও সংশ্লিষ্ট নেতার বিরুদ্ধে আইন মেনে পদক্ষেপ করার কথা বলেন তিনি। একই অনুষ্ঠানে বামপন্থী রাজনীতিরও সমালোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিউনিস্ট ও তাঁর ভাষায় ‘দিমাগি নকশাল’ প্রভাব নিয়ে আক্রমণ শানান তিনি। বিকাশরঞ্জনের বাড়িতে হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে তাই পুলিশের তদন্তের পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিষয়টিও সামনে এসেছে।