নিজস্ব সংবাদদাতা, কাকদ্বীপ: মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কাকদ্বীপে প্রথম প্রশাসনিক বৈঠকে এসে সুন্দরবন উন্নয়নের জন্য কার্যত কল্পতরু হলেন শুভেন্দু অধিকারী। মঙ্গলবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার এই মেগা ইভেন্ট থেকে যেমন মুড়িগঙ্গা ব্রিজ তৈরি ও কাকদ্বীপকে আলাদা জেলা করার বড়সড় প্রতিশ্রুতি দিলেন তিনি, তেমনই সিএএ (CAA) কার্যকর করা এবং আগের সরকারের দুর্নীতি নিয়ে দিলেন কড়া বার্তা। এদিনের মঞ্চ থেকে একাধিক সরকারি প্রকল্পের সুবিধা সরাসরি উপভোক্তাদের হাতে তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী।
সুন্দরবনের জন্য ১২০০ কোটির বরাদ্দ ও মুড়িগঙ্গা ব্রিজ
দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত সুন্দরবনের ভোল বদলাতে একগুচ্ছ ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, আগের সরকারের আমলে সুন্দরবনের জন্য বরাদ্দ ৬০০ কোটি টাকার বেশিরভাগটাই 'চুরি' হয়েছিল। কিন্তু তাঁর সরকার আট মাসের বাজেটে সুন্দরবনের জন্য ১২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। এর মধ্যে ৫৫৩টি কাজের টেন্ডার ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছে।
সবচেয়ে বড় ঘোষণাটি আসে মুড়িগঙ্গা ব্রিজ নিয়ে। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, "আগের সরকার মুড়িগঙ্গা ব্রিজ নিয়ে শুধু মিথ্যা কথা বলে গিয়েছিল। আমি কথা দিয়ে যাচ্ছি, ২০২৯ সালে এই ব্রিজের উদ্বোধন করব।" পাশাপাশি, কাজের সুবিধার্থে সুন্দরবন উন্নয়ন দপ্তরের মূল সচিবালয় এবার থেকে সুন্দরবন এলাকাতেই তৈরি হবে বলেও ঘোষণা করেন তিনি।
সিএএ এবং 'উদ্বাস্তু' বনাম 'অনুপ্রবেশকারী' বার্তা
এদিনের সভা থেকে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) নিয়ে কড়া বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "বাংলাদেশ থেকে যারা প্রাণ আর ধর্ম বাঁচাতে এসেছে, তারা অনুপ্রবেশকারী নয়, তারা শরণার্থী। আর যারা অশান্তি পাকাতে আসে তারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী।"
শরণার্থীদের দ্রুত সিএএ শংসাপত্র দেওয়ার জন্য এদিনের মঞ্চ থেকেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসক এবং কাকদ্বীপের এসডিও-কে কড়া নির্দেশ দেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাস, "ডিসেম্বরে আমার আগামী সফরের আগেই যেন শরণার্থীরা সিএএ সার্টিফিকেট পেয়ে যান। এরপর জানুয়ারিতেই ভোটার তালিকায় নাম উঠবে এবং প্রকৃত এসসি-এসটিরা জাতিগত শংসাপত্র পাবেন।"
কর্মসংস্থান ও কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা
কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বীমা 'আয়ুষ্মান ভারত'-এর সুবিধা বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া নিয়ে এদিনের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন তিনি। তিনি জানান, আয়ুষ্মান ভারত ও মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বীমার মাধ্যমে দেশের ৩৮ হাজার হাসপাতালে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্যাশলেস চিকিৎসা পাবেন রাজ্যবাসী।
কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে 'বিকশিত ভারত শ্রীরামজি' প্রকল্পের আওতায় ১০০ দিনের বদলে ১২৫ দিনের কাজ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন তিনি। দিনে ৩০০ টাকা হিসেবে মোট সাড়ে ৩৪ হাজার টাকা পাবেন জব কার্ড হোল্ডাররা। পাশাপাশি, নারীশিক্ষায় উৎসাহ দিতে কলেজ স্তরের ছাত্রীদের জন্য মোট ৫০ হাজার টাকা (প্রথম দুই বছর ১৭ হাজার ও তৃতীয় বছর ১৬ হাজার) অনুদান দেওয়ার ঘোষণাও করেন মুখ্যমন্ত্রী।
দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি ও কাকদ্বীপ জেলা
আগের সরকারের আমলে আমফান, মনরেগা ও আবাস যোজনার টাকা লুটের প্রসঙ্গ তুলে কড়া হুঁশিয়ারি দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, "আগের সরকারের আমলে নেতারা গোয়ালঘর দেখিয়ে আবাস যোজনার বাড়ি নিয়েছে। কিন্তু এবার আর তা হবে না। রাজ্যে প্রায় ৫৪ লক্ষ বাড়ির তালিকা হয়েছে।" ২০২১ সালের ভোট-পরবর্তী হিংসায় জড়িতদের এবং দুর্নীতিবাজদের এক ইঞ্চিও ছাড়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন তিনি।
বক্তব্যের একেবারে শেষে সুন্দরবনবাসীকে বড় চমক দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, আগামী দিনে প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা ভাগ হলে কাকদ্বীপকে আলাদা জেলা করা হবে এবং সুন্দরবনকে একটি 'মডেল' হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
গঙ্গাসাগর মেলাকে এবার কুম্ভমেলার মতো আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিশেষ প্রশাসনিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলেও এদিনের সভা থেকে জানান মুখ্যসচিব মনোজ কুমার আগরওয়াল।
https://www.youtube.com/watch?v=Fix4iM1FnfA