বাংলাস্ফিয়ার: দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত ও ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতার শিকার সুন্দরবনের আর্থ-সামাজিক ও পরিকাঠামো উন্নয়নে বড়সড় আর্থিক অনুদান ও বহুমুখী পরিকল্পনার ঘোষণা করল রাজ্য সরকার। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, জীবিকা নির্বাহ এবং পর্যটন শিল্পের প্রসারের জন্য এককালীন ১২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এর আওতায় মোট ৩,২০২টি জনকল্যাণমূলক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যার ফলে দ্বীপ অঞ্চলের প্রায় ১ লক্ষ ২৪ হাজার মানুষের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

শনিবার সুন্দরবনে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক বৈঠক ও জনসভায় এই মেগা প্রকল্পের বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। বৈঠকে জানানো হয়, প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৫৫৩টি উন্নয়নমূলক কাজের জন্য ইতিমধ্যেই দরপত্র (টেন্ডার) প্রকাশ করা হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই মাঠপর্যায়ে এই কাজগুলি শুরু হবে। এরপর দ্বিতীয় ধাপে আরও ২,৬৪৯টি প্রকল্প বাস্তবায়িত করা হবে। সুন্দরবনের ভঙ্গুর ও পৃথকীকৃত ভৌগোলিক কাঠামোর কথা মাথায় রেখে যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।

প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, সুন্দরবনের বিভিন্ন দ্বীপে যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহণ মসৃণ করতে মোট ১,১৬৯টি নতুন রাস্তা নির্মাণের বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হতে চলেছে, যার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে প্রায় ১,৪০৬ কোটি টাকারও বেশি। এর পাশাপাশি বর্ষার সময়ে জলমগ্নতা ও নিকাশি সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধানের জন্য আধুনিক নিকাশি ব্যবস্থা এবং ১১০টি কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে প্রত্যন্ত দ্বীপগুলির যোগাযোগ রক্ষায় নদীপথে পাঁচটি আধুনিক কংক্রিটের জেটি এবং মালপত্র পরিবহণের জন্য অতিরিক্ত জেটি নির্মাণের কাজও দ্রুত শুরু হবে।

বিশেষ করে সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখে পর্যটন শিল্পকে চাঙ্গা করতে অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পর্যটকদের জন্য পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎচালিত নৌকা (ইলেকট্রিক বোট) চালুর উদ্দেশ্যে আলাদাভাবে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন সুন্দরবনের দূষণ রোধ করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায় নতুন গতি আসবে।

শুধু পরিকাঠামো উন্নয়নই নয়, সুন্দরবনের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন বাড়াতে মৎস্যজীবী ও কৃষকদের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় চাষিদের আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে মৎস্যচাষের আধুনিকীকরণের জন্য। পাশাপাশি জলবায়ু ও পরিবেশের সঙ্গে মানানসই বিকল্প উপার্জনের পথ হিসেবে প্রায় ১,৯৩১ জন উপভোক্তাকে ‘কাঁকড়া মোটাতাজাকরণ’ বা ক্র্যাব ফ্যাটেনিংয়ের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া কৃষি কাজ সহজ ও ফলনশীল করতে প্রায় ১৩,৮৭৭ জন কৃষকের হাতে উন্নত মানের ব্যাটারিচালিত স্প্রেয়ার তুলে দেওয়া হবে।

অনুষ্ঠানে দীর্ঘদিনের আলোচিত মুড়িগঙ্গা নদীর উপর সেতু নির্মাণ প্রসঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, পূর্বতন জমানার নানা অনিশ্চয়তা কাটিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই এই সেতুর কাজ সম্পন্ন হবে এবং আগামী ২০২৯ সালে তিনি নিজেই এই গুরুত্বপূর্ণ সেতুর উদ্বোধন করবেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সুন্দরবনের মতো দুর্গম ও জলবেষ্টিত অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করতে এই মেগা বাজেট এবং বহুমুখী প্রকল্প রূপায়ণ অত্যন্ত সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তবে কেবল ঘোষণা নয়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্বচ্ছতার সঙ্গে এই প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হলে তবেই সুন্দরবনের প্রান্তিক মানুষ এর প্রকৃত সুফল হাতে পাবেন।