বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতার রঙিন উড়ালপুলে পরপর মোটরবাইক পিছলে পড়ার ঘটনায় রাস্তার রংকেই দায়ী করার মতো চূড়ান্ত প্রমাণ এখনও মেলেনি বলে জানাল পুলিশ। বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় কুমার নন্দ বলেন, বৃষ্টির মধ্যে চালকদের অসতর্কতা কিংবা চলন্ত বাইকে ভিডিয়ো তৈরির চেষ্টা থেকেও দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তবে সম্ভাব্য এই ব্যাখ্যাকে তদন্তে প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরেননি তিনি।

বিতর্কের সূত্রপাত বুধবারের একটি ভাইরাল ভিডিয়ো থেকে। চিংড়িঘাটা উড়ালপুলের বৃষ্টিভেজা, সদ্য রং করা অংশে তিনটি মোটরবাইক পরপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়তে দেখা যায় ওই ফুটেজে। দুর্গাপুজোর আগে শহরের রাস্তা ও উড়ালপুল সাজানোর উদ্যোগের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিরোধীদের অভিযোগ, রাস্তার উপর রং লাগিয়ে যানবাহন চলাচলের ঝুঁকি বাড়ানো হয়েছে। প্রশাসন অবশ্য দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছে।

পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও ইঞ্জিনিয়ারেরা জানিয়েছেন, ব্যবহৃত রঙে পিছলে যাওয়া প্রতিরোধের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বৃষ্টির মধ্যে রিল বা ভিডিয়ো করতে গিয়ে চালকেরা ভারসাম্য হারিয়েছিলেন কি না, সেই সম্ভাবনাও দেখা হচ্ছে। তিনি জানান, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ পুলিশের হাতে আসেনি। ফলে ঠিক কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটেছে, তা এখনও নিশ্চিত নয়।

এর মধ্যেই চিংড়িঘাটা উড়ালপুলে দশ মিটার অন্তর আলো প্রতিফলিত করার ‘ক্যাটস আই’ বসানো হয়েছে। বুধবার রাতে কাজ চলাকালীন উড়ালপুল বন্ধ ছিল। গতি কমানোর নির্দেশ দিয়ে সতর্কতামূলক বোর্ডও লাগানো হয়েছে। বৃষ্টির সময়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ওই উড়ালপুলে মোটরবাইকের চলাচল বন্ধ রাখা হতে পারে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার। গড়িয়াহাট উড়ালপুলের জন্য একই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

নন্দ জানান, ইঞ্জিনিয়ারদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী উড়ালপুলের সংযোগস্থলের ইস্পাতের পাত ও কংক্রিটে রং লাগালে পিচ্ছিলতা তৈরি হতে পারে। সাধারণ পিচের রাস্তার সঙ্গে এই অংশগুলির আচরণ এক নয় বলেও তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরেছেন পুলিশ কমিশনার।

চিংড়িঘাটার তীক্ষ্ণ বাঁকের সঙ্গে গড়িয়াহাটের তুলনামূলক সোজা পথের পার্থক্যও ব্যাখ্যা করেছে পুলিশ। বেলেঘাটা ট্রাফিক গার্ডের তরফে গাড়ির গতির উপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। নির্ধারিত সীমার বেশি গতিতে চললে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন আধিকারিকেরা। বৃষ্টির পরে বাইকগুলিকে পর্যায়ক্রমে উড়ালপুলে ঢোকানোর ব্যবস্থাও করা হচ্ছে, যাতে সামনে ফাঁকা রাস্তা পেয়ে চালকেরা অতিরিক্ত গতি তুলতে না পারেন।

অন্যদিকে, রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল সৌন্দর্যায়ন কর্মসূচির পক্ষে সওয়াল করেছেন। তাঁর দাবি, রাস্তা সাজাতে পিছলে যাওয়া প্রতিরোধক রং ব্যবহার করা হয়েছে। এই কাজের খরচ সরকারি কোষাগার থেকে হয়নি; সংস্থার সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর তহবিল থেকে অর্থ এসেছে। কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটল, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রী।

এর আগে অগ্নিমিত্রা জানিয়েছিলেন, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে। রঙের কারণে চালকদের চোখে সমস্যা হচ্ছে কি না, সেই অভিযোগও বিবেচনা করা হবে। প্রয়োজনে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি। মন্ত্রীর বক্তব্য, পুজো উপলক্ষে অস্থায়ীভাবে এই সাজসজ্জা করা হয়েছে; আলপনা বাংলার ঐতিহ্যের অংশ।

তবে বিতর্কের মধ্যেই গড়িয়াহাট উড়ালপুলে যন্ত্র দিয়ে রঙের উপরিভাগ ঘষে রাস্তা খসখসে করার কাজ হয়েছে। আসানসোলের শহিদ ভগৎ সিংহ মোড়েও রং সরানোর ছবি সামনে এসেছে। এই কাজের উল্লেখ করে তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ প্রশ্ন তুলেছেন, রং সরাতেই হলে প্রথমে লাগানো হয়েছিল কেন। দুর্ঘটনার দায় এবং খরচের হিসাব নিয়েও রাজ্য সরকারকে আক্রমণ করেছেন তিনি।

প্রশাসনের বক্তব্যে তাই দুটি বিষয় পৃথক থাকছে: দুর্ঘটনার সঙ্গে রঙের সরাসরি সম্পর্ক এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি, অথচ ঝুঁকি কমাতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একইভাবে, রিল বানানোর প্রসঙ্গটিও পুলিশের অনুমান, প্রমাণিত কারণ নয়। তদন্তের ফল না আসা পর্যন্ত রং অথবা চালকের আচরণকে এককভাবে দায়ী করার ভিত্তি নেই।