শারদোৎসবের আনন্দোচ্ছ্বাসের মাঝেই এক অভূতপূর্ব ও মর্মান্তিক বিপর্যয়ের সাক্ষী থাকল তিলোত্তমা। উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ৯১তম বর্ষের পুজো চোরবাগান সর্বজনীন-এর মণ্ডপে সপ্তমীর রাতে অতিরিক্ত ভিড়, বিশৃঙ্খলা ও পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনায় প্রাণ হারালেন অন্তত ১৭ জন দর্শনার্থী (যার মধ্যে ১৩ জন নারী, ৩ জন পুরুষ ও ১ জন শিশু রয়েছে)। আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন, যাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক।
এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির জেরে একদিকে যেমন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর বাতিল হয়েছে, অন্যদিকে রাজ্য সরকার হাইকোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত ‘সিট’ (SIT) তদন্তের নির্দেশ ও নিহতদের পরিবারপিছু ২৫ লক্ষ টাকার ক্ষতিপূরণের কথা ঘোষণা করেছে।
চোরবাগানের এবারের থিম ও আকর্ষণ: কেন জমেছিল উপচে পড়া ভিড়?
উত্তর কলকাতার মুক্তারাম বাবু স্ট্রিট ও রাম মন্দির সংলগ্ন চোরবাগান সর্বজনীনের পুজো এ বার পা দিয়েছিল ৯১তম বর্ষে।
বিশেষ থিম ‘অ-রব’: এ বছর শিল্পী সুশান্ত শিবানী পাল-এর ভাবনায় তৈরি হয়েছিল চোরবাগানের অনন্য থিম ‘অ-রব’। নিস্তব্ধতা ও সুক্ষ্ম শিল্পভাবনাকে কেন্দ্র করে মণ্ডপ ও আলোকসজ্জার যে অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটানো হয়েছিল, তা শুরু থেকেই দর্শনার্থীদের বিপুল নজর কাড়ে।
‘সেরার সেরা’ তকমা: রাজ্য সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর, কলকাতা পুরসভা ও কলকাতা পুলিশের যৌথ উদ্যোগে বাছাই করা ২৩টি সেরা পুজোর তালিকায় ‘সেরার সেরা’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিল চোরবাগান সর্বজনীন।
পঞ্চমী থেকেই জনজোয়ার: এই ঝুলিতে থাকা পুরস্কার ও নান্দনিক থিমের বার্তা ছড়িয়ে পড়তেই পঞ্চমী ও ষষ্ঠী থেকেই মণ্ডপ চত্বরে উপচে পড়া ভিড় জমা হতে শুরু করেছিল। মহাত্মা গান্ধী রোড মেট্রো স্টেশন কাছে হওয়ায় স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি দর্শনার্থী সপ্তমীর সন্ধ্যায় মণ্ডপমুখী হয়েছিলেন।
কীভাবে ঘটল ঘটনাটি? বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপট ও মুহূর্তের বিবরণ
সপ্তমীর সন্ধ্যা ৭:৩০ টা নাগাদ মণ্ডপ চত্বরে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়:
প্রবল বৃষ্টি ও ভিড়ের বিপরীতমুখী চাপ: হঠাৎই উত্তর কলকাতায় মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। মণ্ডপের ভেতরে থাকা হাজার হাজার দর্শনার্থী বৃষ্টি থেকে বাঁচতে বাইরে বেরোচ্ছিলেন না। অন্যদিকে, সরু গলিতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অগণিত মানুষ ভিজে যাওয়া এড়াতে একযোগে জোর করে মণ্ডপের ভেতরে ঢুকতে যান। এতে তৈরি হয় দুই দিক থেকে তীব্র বিপরীতমুখী চাপ।
মাইকের ঘোষণা ও বাঁশির শব্দে আতঙ্ক: পরিস্থিতির জটিলতা দেখে পুজো কমিটির মাইক থেকে হঠাৎই একটি জরুরি ঘোষণা করা হয় এবং ভিড় সামলাতে কিছু স্বেচ্ছাসেবক বিকট শব্দে বাঁশি বাজাতে থাকেন। প্রবল ভিড়ের মধ্যে এই আচমকা ঘোষণা ও বাঁশির আওয়াজে দর্শনার্থীদের মনে ‘বিপদ ঘটেছে’ ভেবে চরম প্যানিক (Panic) ছড়িয়ে পড়ে।
সংকীর্ণ এক্সিট গেট ও বন্ধ ইমার্জেন্সি দুয়ার: চোরবাগানের ঢোকার ও বেরোনোর রাস্তা এমনিতেই সংকীর্ণ। তার ওপর অভিযোগ উঠেছে যে, বিপদের সময় যে জরুরি নির্গমন দুয়ার (Emergency Exit Gate) খোলা থাকার কথা, তা বন্ধ ছিল।
আলো বন্ধ ও আধঘণ্টার বিভীষিকা: বিশৃঙ্খলা চরমে উঠলে পুজো উদ্যোক্তাদের তরফে মণ্ডপের সমস্ত আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়। ফলে ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে একে অপরের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েন দর্শনার্থীরা। প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে চলে এই পদপিষ্ট হওয়ার ভয়াবহ পরিস্থিতি।
উদ্ধারকাজ, হেল্পলাইন ও হাসপাতালে জরুরি পরিস্থিতি
ঘটনার পরই লালবাজারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কলকাতা পুলিশের ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট গ্রুপ (DMG) ও দমকলের একাধিক ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে।
জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসকদের তলব: উদ্ধার করা আহতদের দ্রুত কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিস্থিতির গাম্ভীর্য বুঝে মেডিক্যাল কলেজের সমস্ত বিভাগের ইউনিট ইনচার্জ ও চিকিৎসকদের ডিউটিতে যোগ দেওয়ার জরুরি নির্দেশ জারি করা হয়।
হাসপাতালে স্থানান্তরিতকরণ: আশঙ্কাজনক কয়েকজনকে নীলরতন সরকার (NRS) মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।
জরুরি হেল্পলাইন সেবা: স্বজনদের সহায়তায় রাজ্য সরকার ও কলকাতা পুলিশ বিশেষ হেল্পলাইন নম্বর চালু করেছে:
রাজ্য সরকারের জরুরি হেল্পলাইন:1800-345-5678
কলকাতা পুলিশের হেল্পলাইন:033-2214-1310স্বজনহারাদের আকুল কান্না: উৎসবের রাতে স্বজনদের খোঁজে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে জমা হন পরিবারের সদস্যরা। আহতদের পাশে দাঁড়াতে হেল্পলাইন চালু করেছে এবং রক্তদানের প্রস্তুতি রেখেছে এসএফআই (SFI)।
প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদক্ষেপ
এই দুর্ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও শোক প্রকাশ করেছেন শীর্ষ কেন্দ্র নেতৃত্ব:
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সমবেদনা: রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে মৃতদের পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে অনুদানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
অমিত শাহের সমস্ত কর্মসূচি বাতিল: দুদিনের রাজ্য সফরে এসে কলকাতায় অবস্থানরত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই রবিবারের বেলুড় মঠ ও পুজো পরিক্রমাসহ সমস্ত কর্মসূচি বাতিল করেন। তিনি নিজে হাসপাতালে গিয়ে আহত দর্শনার্থীদের দেখতে যাবেন।
মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা: ক্ষতিপূরণ, সরকারি চাকরি ও আইনি পদক্ষেপ
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাধীন দর্শনার্থীদের দেখতে যান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখান থেকেই রাজ্য সরকারের একাধিক বড় পদক্ষেপের কথা জানান তিনি:
২৫ লক্ষ টাকা ও চাকরি: পদপিষ্ট হয়ে মৃতদের পরিবারপিছু ২৫ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য এবং পরিবারের একজন সদস্যকে সরকারি চাকরি দেওয়ার ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার।
বিচারপতির নেতৃত্বে SIT ও ফরেনসিক তদন্ত: ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তে হাইকোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে একটি 'সিট' (SIT) বা তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। লালবাজারের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF), ফরেনসিক টিম এবং সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ খতিয়ে দেখে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
উদ্যোক্তা আটক: ফায়ার সেফটি ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের নিয়মাবলী অমান্য করায় অভিযুক্ত পুজো কমিটির কয়েকজনকে ইতিমধ্যেই জিজ্ঞাসাবাদ ও আটক করেছে পুলিশ।
বন্ধ কলকাতার একাধিক বড় পুজো ও সারা দেশে সতর্কতা
চোরবাগানের দুর্ঘটনার পরই নিরাপত্তার স্বার্থে কলকাতার বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় পুজো মণ্ডপ দর্শনার্থীদের জন্য আপাতত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে টালা প্রত্যয়, আলিপুর সার্বজনীন এবং চেতলা অগ্রণী। অ্যালেন পার্কের বিশেষ শারদীয় অনুষ্ঠানও বাতিল করা হয়েছে।
দিল্লিতে বিশেষ SOP: কলকাতার ঘটনার রেশ পৌঁছেছে দিল্লিতেও। দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্ক (C.R. Park), করোলবাগ, ও নয়ডা কালীবাড়ির পুজো মণ্ডপগুলিতে ভিড় নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত নিরাপত্তা রক্ষী ও বিশেষ 'SOP' চালু করা হয়েছে।
রাজনীতিতে তীব্র চাপানউতোর
চোরবাগানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে কড়া রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে:
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শোকপ্রকাশ: প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সোশ্যাল মিডিয়ায় শোক প্রকাশ করে আহতদের দ্রুত আরোগ্য প্রার্থনা করেন।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তোপ: সরকারের গাফিলতির ইঙ্গিত দিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন, "সাধারণ মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের মূল দায়িত্ব। মানুষের জীবনের চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না।"
কুণাল ঘোষের কড়া প্রশ্ন: কুণাল ঘোষ উদ্যোক্তা ও পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, "এত বড় দুর্ঘটনার দায় কার? কেন আগে থেকে ভিড় সামলাতে সঠিক পরিকল্পনা ছিল না?"
বাম ও কংগ্রেসের আক্রমণ: প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার অভিযোগ করেন, "বুলডোজার দিয়ে বইয়ের স্টল ভাঙতে প্রশাসন তৎপর, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভিড় সামলাতে নিষ্ক্রিয়।" অন্যদিকে, সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম অবিলম্বে আহত ও নিহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের দাবি তুলেছেন।
অষ্টমীর ভোরে পৌঁছানোর আগেই 'অ-রব' থিমের সাজানো মণ্ডপ ঢেকে গেল এক বিষাদময় নিস্তব্ধতায়। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় প্রশাসন এখন উদ্ধার, চিকিৎসা এবং কড়া তদন্তে জোর দিচ্ছে।