কলকাতা, ২৪ অক্টোবর: বিসর্জনের সময় কেবল সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই দুর্গাপ্রতিমা স্পর্শ করতে পারবেন—মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই মন্তব্য ঘিরে বিতর্কের মধ্যে নিজেদের ভূমিকা স্পষ্ট করলেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ। শুক্রবার লালবাজারে সাংবাদিকদের তিনি জানান, বিসর্জনে কারা অংশ নেবেন, তা সংশ্লিষ্ট পুজো কমিটিই নির্ধারণ করে। এই সিদ্ধান্তে পুলিশের সরাসরি ভূমিকা নেই; পুলিশের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা।

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিমা বহনকারীদের নাম ও পরিচয় নথিভুক্ত করার কথা পুলিশ কমিশনারকে বলা হয়েছিল। সেই সূত্রেই সাংবাদিকেরা জানতে চান, কে সনাতন ধর্ম মানেন, তা পুলিশ কী ভাবে চিহ্নিত করবে। কমিশনার এই চিহ্নিতকরণ পদ্ধতি ব্যাখ্যা করেননি। তাঁর বক্তব্য, বিসর্জনের আয়োজন পুজো কমিটিগুলিই পরিচালনা করে। কোনও আইনভঙ্গের ঘটনা ঘটলে এবং নির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের হলে পুলিশ নিয়মমাফিক ব্যবস্থা নেবে।

বুধবার, ২১ অক্টোবর, দশমীর দিন কলকাতায় বিসর্জনের প্রস্তুতি দেখতে গিয়ে শুভেন্দু বলেছিলেন, ধর্মীয় শুচিতা রক্ষায় দীর্ঘদিনের প্রথা, শাস্ত্র ও বিধি মেনে চলা প্রয়োজন। তাঁর যুক্তি, দুর্গাপুজো উৎসব হলেও প্রথমত একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান। সেই কারণেই প্রতিমা স্পর্শের ক্ষেত্রে সনাতন ধর্মে বিশ্বাসীদের অংশগ্রহণের কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি দাবি করেন, এই বক্তব্যের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার কোনও বিষয় নেই।

মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের পরে পুজো কমিটিগুলিকে নিয়ম মেনে চলার কথা জানানো হয়েছে বলেও জানিয়েছেন কমিশনার। তবে সনাতনী পরিচয় যাচাইয়ের মানদণ্ড কী, সে বিষয়ে স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি। অজয় নন্দের বক্তব্য, প্রচলিত সনাতন রীতির বাইরে অন্য কোনও পদ্ধতিতে দুর্গাপুজো হওয়ার কথা তাঁর জানা নেই। ফলে আচার পালনের নির্দেশ এবং অংশগ্রহণকারীর ধর্মীয় পরিচয় যাচাই—এই দুই বিষয় কী ভাবে কার্যকর হবে, তা অস্পষ্ট রয়ে গিয়েছে।

শুভেন্দুর বক্তব্যে আরও একটি প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। তিনি কি বিসর্জনের শোভাযাত্রায় থাকা পুজো উদ্যোক্তাদের বোঝাচ্ছেন, নাকি ট্রাক থেকে প্রতিমা নামিয়ে নদীতে নিয়ে যাওয়ার কাজে যুক্ত শ্রমিকদেরও একই শর্তের আওতায় আনতে চাইছেন? প্রতিমা বহনের কাজ এবং ধর্মীয় আচার পালনের মধ্যে তাঁর নির্দেশে কোনও পৃথক সীমা টানা হয়নি। পুলিশ কমিশনারের ব্যাখ্যাতেও শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এই নির্দেশ প্রয়োগের পদ্ধতি স্পষ্ট হয়নি।

বিষয়টি নিয়ে বিরোধীরা ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীকে আক্রমণ করেছেন। প্রাক্তন সাংসদ ও সিপিএম নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য প্রশ্ন তুলেছেন, কে সনাতনী এবং কে নন, তা নির্ধারণের কোনও তালিকা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে রয়েছে কি না। কী ভাবে কেউ সনাতনী হিসেবে বিবেচিত হবেন, তার ব্যাখ্যাও চেয়েছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, এই বক্তব্যের পিছনে আরএসএসের রাজনৈতিক কর্মসূচি কাজ করছে।

কংগ্রেস নেতা সুমন রায়চৌধুরী এই মন্তব্যকে দেশের বহুত্ববাদের সাংবিধানিক অঙ্গীকারের বিরোধী বলে সমালোচনা করেছেন। তৃণমূলের বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য, এমন সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে হিন্দুধর্মকে বোঝা যায় না। বিরোধীদের আপত্তির কেন্দ্রে রয়েছে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে অংশগ্রহণের সীমা নির্ধারণের বিষয়টি। অন্য দিকে, মুখ্যমন্ত্রী তাঁর অবস্থান ব্যাখ্যা করতে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও পবিত্রতা রক্ষার যুক্তিই সামনে এনেছেন।

এ বার বিসর্জনের ব্যবস্থাপনাতেও কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রতিমা সামলানোর কাজে ক্রেনের বদলে ট্রলি ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। বিসর্জন শেষে নদী থেকে কাঠামো সরিয়ে পরিষ্কার করার ব্যবস্থার কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে এই ব্যবস্থাপনাগত নির্দেশগুলির পাশাপাশি সনাতনী পরিচয়সংক্রান্ত বক্তব্যই রাজনৈতিক বিতর্কের প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। বাজে কদমতলা, নিমতলা ও গোয়ালিয়র ঘাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিসর্জনস্থলে বিশেষ যান্ত্রিক ঢাল, ট্রলি এবং কনভেয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

কমিশনারের বক্তব্যে পুলিশের দায়িত্বের সীমা বোঝা গেলেও মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন কাটেনি। পুজো কমিটিগুলি কোন ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে এবং পরিচয় নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে কী হবে, তার ব্যাখ্যা মেলেনি। ফলে বিতর্ক এখন ধর্মীয় রীতি মানার পাশাপাশি বিসর্জনে অংশগ্রহণের অধিকার ও প্রশাসনিক দায়িত্বের সীমা নিয়েও।