বাংলাস্ফিয়ার: ষাটের দশকে চলচ্চিত্রে অর্থ জোগানোর সূত্রে অপরাধজগতের সঙ্গে যোগাযোগের শুরু। পরে রাজীব রাই ও রাকেশ রোশনের ওপর গুলিচালনা থেকে তারকাদের বাড়িতে হামলা—তিন দশকজুড়ে গুলি, তোলাবাজি ও ভয় দেখানোর এক দীর্ঘ ইতিহাস।

মুম্বইয়ের অপরাধজগতের সঙ্গে হিন্দি চলচ্চিত্রশিল্পের সম্পর্কের সূত্রপাত গত শতকের ষাটের দশকে। সে সময় হাজি মস্তানের মতো অপরাধজগতের নেতারা চলচ্চিত্রের ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন এবং প্রথাগত ব্যবস্থার বাইরে ছবির জন্য অর্থ জোগাতেন। আশির দশকের শেষভাগ এবং নব্বইয়ের দশকে এই সম্পর্ক ক্রমশ চাপ ও জবরদস্তির চেহারা নেয়। অভিযোগ ওঠে, অপরাধী গোষ্ঠীগুলি ছবি তৈরিতে টাকা ঢালার পাশাপাশি বিদেশে ছবির পরিবেশনার স্বত্ব দাবি করছে, এমনকি কোন অভিনেতা-অভিনেত্রীকে নেওয়া হবে, তা-ও ঠিক করে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।

নব্বইয়ের দশকের হামলা

চলচ্চিত্রজগতের মানুষদের ওপর হামলার গোড়ার দিকের ঘটনাগুলির মধ্যে ছিল ১৯৯৪ সালের জুনে প্রযোজক জাভেদ রিয়াজ সিদ্দিকির খুন। মুম্বই পুলিশের অপরাধ দমন শাখার নথির ভিত্তিতে তৈরি সংগঠিত অপরাধসংক্রান্ত একটি গবেষণায় অপরাধীদের হিংসার শিকার চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বদের মধ্যে সিদ্দিকির নাম উল্লেখ করা হয়। একই তালিকায় ১৯৯৪ সালের জুলাইয়ে ফিরোজ সরফরাজ খান নামে এক প্রযোজকের ওপর হামলার কথাও নথিভুক্ত ছিল।

১৯৯৭ সালের ৭ মার্চ আন্ধেরিতে নিজের দফতরে গুলিতে খুন হন প্রযোজক ও পরিচালক মুকেশ দুগ্গল। তিনি ‘ফতেহ’, ‘সাথী’ ও ‘প্ল্যাটফর্ম’-এর মতো ছবি প্রযোজনা করেছিলেন এবং ‘গোপী কিষণ’ পরিচালনা করেছিলেন। প্রতিদ্বন্দ্বী অপরাধচক্রের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তদন্তকারীদের সন্দেহ ছিল, ছোটা রাজন ও ছোটা শাকিলের সহযোগীদের মধ্যে সংঘাতের সঙ্গে তাঁর হত্যার যোগ রয়েছে।

১৯৯৭ সালের ৩১ জুলাই তারদেওতে নিজের দফতরের বাইরে আক্রান্ত হন ‘ত্রিদেব’ ও ‘গুপ্ত’-এর পরিচালক রাজীব রাই। তাঁর দেহরক্ষী পাল্টা গুলি চালান। রাই অক্ষত অবস্থায় রক্ষা পান। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, হামলাকারীরা আবু সালেমের দলের সদস্য ছিল। গুলিচালনার আগেও রাই হুমকি পেয়েছিলেন বলে জানা যায়।

এর দু’সপ্তাহেরও কম সময় পরে, ১৯৯৭ সালের ১২ আগস্ট, আন্ধেরিতে একটি মন্দিরের বাইরে গুলি করে খুন করা হয় সংগীত প্রযোজক এবং টি-সিরিজের প্রতিষ্ঠাতা গুলশন কুমারকে। চলচ্চিত্র ও সংগীতশিল্পে অপরাধজগতের প্রভাব বিস্তারের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলির অন্যতম হয়ে ওঠে এই হত্যাকাণ্ড।

নিশানায় মনমোহন শেট্টি ও রাকেশ রোশন

নব্বইয়ের দশকের শেষভাগেও হিংসা অব্যাহত ছিল। ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে প্রাণঘাতী হামলা থেকে বেঁচে যান চলচ্চিত্র প্রযোজক ও অ্যাডল্যাবসের প্রতিষ্ঠাতা মনমোহন শেট্টি। ২০০৩ সালে এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আবু সালেমের হয়ে কাজ করা এক ভাড়াটে খুনি ১৯৯৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর তাঁকে গুলি করার চেষ্টা করেছিল। এরপর থেকে শেট্টি সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী সঙ্গে নিয়ে যাতায়াত করতেন এবং সিসিটিভি ক্যামেরায় নজর রাখতেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসা লোকজনের ওপর।

২০০০ সালের ২১ জানুয়ারি সান্তাক্রুজ পশ্চিমে নিজের দফতরের বাইরে গুলিবিদ্ধ হন অভিনেতা, পরিচালক ও প্রযোজক রাকেশ রোশন। তার কিছুদিন আগেই মুক্তি পেয়ে সাফল্য পেয়েছিল ‘কহো না… পেয়ার হ্যায়’, যে ছবির মাধ্যমে তাঁর ছেলে হৃতিক রোশনের চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়। একটি গুলি রাকেশের বাহুতে লাগে, অন্যটি তাঁর বুক ছুঁয়ে বেরিয়ে যায়। চিকিৎসার পর তিনি প্রাণে বেঁচে যান।

পরে সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রোশন জানান, অপরাধজগতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অর্থে তৈরি একটি ছবিতে হৃতিককে অভিনয় করাতে চাওয়া হয়েছিল। সেই দাবি মেনে ছেলের শুটিংয়ের দিনক্ষণ বদলাতে তিনি রাজি হননি। ২০২৬ সালের এপ্রিলে পরিচালক রামগোপাল বর্মাও একই ধরনের বিবরণ দেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ছোটা শাকিলের চক্রের চাপের কাছে নতিস্বীকার করতে অস্বীকার করার পরই রোশনের ওপর গুলি চালানো হয়।

খুন এক অভিনেতা, আর এক পরিচালককে ভয় দেখাতে গুলি

২০০১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বোরিভলির ন্যাশনাল পার্কে গুলি করে খুন করা হয় অভিনেতা ও প্রযোজক দীনেশ আনন্দকে। হিন্দি ছবিতে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন। নিহত প্রযোজক মুকেশ দুগ্গলের ছবিতে নিয়মিত অভিনয় করতেন আনন্দ।

২০০২ সালের জুলাইয়ে ওশিওয়ারায় নিজের দফতরের বাইরে হামলা থেকে বেঁচে যান ‘সাজন’-এর পরিচালক লরেন্স ডি’সুজা। দুই বন্দুকবাজ গুলি চালালেও সরাসরি তাঁকে নিশানা করেনি। একটি গুলি শূন্যে ছোড়া হয়, আর একটি লাগে ফটকে এবং তৃতীয়টি পাশের একটি বাড়ির দেওয়ালে লাগে। পুলিশের সন্দেহ ছিল, এজাজ লাকড়াওয়ালা গোষ্ঠীকে তোলার টাকা দিতে চলচ্চিত্রজগতকে ভয় দেখানোই ছিল এই হামলার উদ্দেশ্য। ডি’সুজা এর আগে টেলিফোনে টাকা চেয়ে হুমকি পেয়েছিলেন বলে খবর।

বদলেছে পর্ব, থামেনি হামলা

সময়ের সঙ্গে হিংসার ধরন বদলেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে গুলিচালনা ও হুমকির ঘটনা ফের সংবাদশিরোনামে উঠে এসেছে।

২০২৪ সালের ১৪ এপ্রিল বান্দ্রায় সলমন খানের বাড়ির বাইরে মোটরসাইকেলে আসা দুই আততায়ী কয়েক রাউন্ড গুলি চালায়। অভিনেতা আহত হননি। মুম্বই পুলিশের অভিযোগ, কারাবন্দি অপরাধী লরেন্স বিষ্ণোইয়ের নির্দেশে এই হামলা চালানো হয়েছিল। মহারাষ্ট্রের সংগঠিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আইনে ছয় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয় পুলিশ।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে উত্তরপ্রদেশের বরেলিতে অভিনেত্রী দিশা পাটানির পারিবারিক বাড়ির বাইরে গুলি চালায় বন্দুকবাজেরা।

২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জুহুতে চলচ্চিত্র পরিচালক রোহিত শেট্টির বাসভবন লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এপ্রিলে ১৭ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয় মুম্বই পুলিশ। পুলিশের অভিযোগ, নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে লরেন্স বিষ্ণোই গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত একটি দল এই হামলা চালিয়েছিল। তবে ঠিক কী কারণে শেট্টিকে নিশানা করা হয়েছিল, তা স্পষ্ট হয়নি।

রবিবার টাইগার শ্রফকে ঘিরে যে গুলিচালনার খবর পাওয়া গিয়েছে, তা এই দীর্ঘ ইতিহাসের সর্বশেষ ঘটনা।