বাংলাস্ফিয়ার: দেশের অন্যতম প্রধান চলচ্চিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে উপাচার্য সন্তোষ আজমেরাকে নিগ্রহ, তাঁর দপ্তরে ভাঙচুর এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ছয় পড়ুয়াকে বহিষ্কার করা হয়েছে। শুক্রবার এই সিদ্ধান্তের কথা সামনে আসে। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে আন্দোলন চলার মধ্যেই এই শাস্তিমূলক পদক্ষেপে কর্তৃপক্ষ ও পড়ুয়াদের সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। ছাত্র সংসদ অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, বহিষ্কারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার সকালের মধ্যে উপাচার্যের দপ্তরে পাথর ছোড়া হয়। জানলার কাচ ভাঙার পাশাপাশি জল ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সংযোগও ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ। বৃহস্পতিবার সকালে দপ্তরে এসে ভাঙা কাচ ও ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন দেখতে পান উপাচার্য। পরে তাঁর দপ্তরের বাইরের করিডরে সিসিটিভি বসানোর নির্দেশ দেওয়া হলে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়।

প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ, এরপর উপাচার্যকে ঘিরে ধরে স্লোগান ও কটূক্তি করা হয় এবং এক পড়ুয়া তাঁকে শারীরিকভাবে নিগ্রহ করেন। জরুরি বৈঠকে ডিন কাউন্সিল বহিষ্কারের সুপারিশ করে। সেই বৈঠকে শিক্ষক, বিভাগীয় প্রতিনিধি ও রেজিস্ট্রার মিলিয়ে ১১ জন উপস্থিত ছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। কাউন্সিলের বক্তব্য, এ ধরনের ঘটনা ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার পক্ষে গুরুতর উদ্বেগের। আজমেরাও অভিযোগ করেছেন, কয়েকজন পড়ুয়ার আচরণে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে।

অন্যদিকে, ছাত্র সংসদ এই অভিযোগগুলিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে। সংসদের মুখপাত্র সুদীপ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, তাঁদের পাঁচজনকে অন্যায়ভাবে বহিষ্কারের ইমেল পাঠানো হয়েছে এবং তাঁরা আইনি পদক্ষেপ করছেন। ফলে বহিষ্কৃতের সংখ্যা নিয়ে কর্তৃপক্ষের ছয়জনের হিসাব এবং ছাত্র সংসদের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে।

পড়ুয়াদের দাবি, বিরোধের সাম্প্রতিক সূত্র সিসিটিভি বসানো। ২০২৪ সালে টানা ১৬ দিনের আন্দোলনের পরে হওয়া সমঝোতা অনুযায়ী, ক্যামেরা বসানোর আগে ছাত্র সংসদকে জানানো এবং স্থান নির্বাচনে তাদের যুক্ত করার কথা। তাঁদের আরও দাবি, ৩০ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে উপাচার্য ভবিষ্যতে ক্যামেরা বসানোর অন্তত তিন দিন আগে জানানোর আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার প্রশাসনিক ভবনের দোতলায় ক্যামেরা বসানো হচ্ছে জানতে পারলেও আগাম কোনও বার্তা তাঁরা পাননি।

ছাত্র সংসদের বক্তব্য, সেই কারণেই পড়ুয়ারা দোতলায় অবস্থান করেন। উদ্দেশ্য ছিল শান্তিপূর্ণভাবে আপত্তি জানানো এবং পূর্ববর্তী সমঝোতা মানার দাবি তোলা। তাঁদের দাবি, আন্দোলনে অবস্থান, মিছিল, স্লোগান ও শিল্পমাধ্যমে প্রতিবাদকেই বেছে নেওয়া হয়েছে; হিংসাকে নয়। উপাচার্য পুলিশ ডেকে আন্দোলনকারীদের ভয় দেখাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেছে সংসদ। সভাপতি ও ফিল্ম বিভাগের সাধারণ সম্পাদকের নাম উল্লেখ করে থানায় জেনারেল ডায়েরি করা হয়েছে বলে তাদের দাবি। বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের পাশাপাশি আজমেরার পদত্যাগের দাবিতেও অনড় রয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

এই সংঘাতের পটভূমিতে রয়েছে ২৭ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। ক্যাম্পাসের অডিটোরিয়ামে আরএসএস-ঘনিষ্ঠ অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে পড়ুয়া ও সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। কয়েকজন পড়ুয়ার বিরুদ্ধে ব্যানার ছেঁড়ার অভিযোগ ওঠে; পরবর্তী সংঘর্ষে একাধিক ব্যক্তি আহত হন। তারপর থেকেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চেয়ে ক্লাস বয়কট ও অবস্থান শুরু করেন পড়ুয়ারা।

৪ অক্টোবর হিন্দু জাগরণ মঞ্চের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করেও নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়। ছাত্র সংসদ উপাচার্যের পদত্যাগ, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার এবং হিংসার ঘটনাগুলির স্বাধীন তদন্ত দাবি করে অনির্দিষ্টকালীন আন্দোলন চালাচ্ছে। বিভিন্ন থানায় একাধিক এফআইআরও দায়ের হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে ছয় পড়ুয়ার বহিষ্কার আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করল।

এদিকে প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ফিল্ম এবং ইলেকট্রনিক অ্যান্ড ডিজিটাল মিডিয়া শাখার নিয়মিত শিক্ষাক্রম ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। ফলে শৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্ন এবং পড়ুয়াদের নিরাপত্তার দাবি ঘিরে চলতে থাকা দ্বন্দ্বের সরাসরি প্রভাব পড়ছে পাঠদানেও। বহিষ্কারকে ঘিরে এই পরিস্থিতিতে ছাত্র সংসদ অভিযোগ অস্বীকার করে আন্দোলন ও আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে।