বাংলাস্ফিয়ার: আমেরিকায় গ্রেফতার হল পলাতক গ্যাংস্টার হিমাংশু ভাউ। লাস ভেগাসে তার অবস্থান সম্পর্কে ভারতীয় কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি তথ্য দেওয়ার পরে তাকে আটক করে মার্কিন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। আর এক পলাতক অপরাধী নীরজ ফরিদপুরিয়াকেও ধরা হয়েছে। দু’জনকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে ভারতীয় সংস্থাগুলি।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ সূত্র জানিয়েছে, দিল্লি ও হরিয়ানা পুলিশের একাধিক দল হিমাংশুর সন্ধানে কাজ করছিল। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং গোপন সূত্রের তথ্য মিলিয়ে লাস ভেগাসে তার অবস্থান চিহ্নিত করা হয়। সেই তথ্য মার্কিন কর্তৃপক্ষকে পাঠানোর পরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। ২০২৩ সালের অগস্টে তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারি হয়েছিল।

একটি সংবাদসংস্থা জানিয়েছে, নেভাডার হেন্ডারসন ডিটেনশন সেন্টারে মার্কিন অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা আইসিই-র হেফাজতে রয়েছে দু’জন। সরকারি অনলাইন বন্দি-তালিকায় তাদের নাম হিমাংশু সিগরোহা এবং নীরজ কৌশিক। আধিকারিকেরা জানিয়েছেন, এরাই হিমাংশু ভাউ ও নীরজ ফরিদপুরিয়া। আইসিই-র লাস ভেগাসের সংশ্লিষ্ট দফতর তাদের বিষয়টি দেখছে।

নীরজকে এর আগেও চলতি বছরে আটক করা হয়েছিল। জামিনে মুক্তির পরে তার গতিবিধি নজরে রাখতে গোড়ালিতে বৈদ্যুতিন নজরদারি যন্ত্র পরানো হয়। অভিযোগ, সেটি খুলে ফেলে সে পালিয়ে যায়। আইএএনএসের প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত গ্রেফতার নিয়ে আইসিই কিংবা এফবিআই কোনও প্রকাশ্য বিবৃতি দেয়নি। আমেরিকায় তাদের বিরুদ্ধে নতুন কোনও ফৌজদারি অভিযোগের তথ্যও ওই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

হরিয়ানার রোহতকের বাসিন্দা হিমাংশুর বিরুদ্ধে খুন, খুনের চেষ্টা, তোলাবাজিসহ ত্রিশের বেশি মামলা রয়েছে বলে পুলিশের দাবি। কিশোর বয়সেই সংশোধনাগার থেকে পালানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পরবর্তী সময়ে বিদেশে বসে উত্তর ভারতের বিভিন্ন এলাকায় অপরাধচক্র চালানোর অভিযোগ ওঠে। লরেন্স বিষ্ণোই গোষ্ঠীর প্রতিদ্বন্দ্বী বাম্বিহা গোষ্ঠীর সঙ্গে তার দলের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলেও মনে করে পুলিশ।

পুলিশের বক্তব্য উদ্ধৃত করে সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, জাল নথির সাহায্যে পাসপোর্ট তৈরি করে ভারত ছেড়েছিল হিমাংশু। পর্তুগালে তার অবস্থান এবং সেখান থেকে অপরাধচক্র পরিচালনার সন্দেহও রয়েছে। দিল্লি ও হরিয়ানা পুলিশের সর্বাধিক সন্ধানাধীন অপরাধীদের তালিকায় ছিল তার নাম। তার এবং সহযোগীদের বিরুদ্ধে হরিয়ানা, দিল্লি ও উত্তরপ্রদেশে খুন, অপহরণ ও তোলাবাজির একাধিক অভিযোগ রয়েছে।

তদন্তকারীদের দাবি, বিদেশ থেকে ব্যবসায়ীদের ফোন করে টাকা চাইত ভাউয়ের দল। টাকা দিতে অস্বীকার করলে স্থানীয় সহযোগীদের দিয়ে বাড়ির বাইরে গুলি চালিয়ে আতঙ্ক তৈরি করা হত। সমাজমাধ্যমও ছিল নতুন সদস্য সংগ্রহের মাধ্যম। দলের পোস্টে মন্তব্য করা কিংবা অনুসরণ করা তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ করে গুলি চালানোর কাজ দেওয়া হত বলে এনআইএ সূত্রের অভিযোগ।

এই চক্রের নাম উঠে এসেছিল ইউটিউবার এলভিশ যাদবের গুরুগ্রামের বাড়ির বাইরে গুলিচালনার ঘটনাতেও। ২০২৫ সালের ১৭ অগস্টের ওই হামলার পরে ভাউয়ের দল সমাজমাধ্যমে দায় স্বীকার করেছিল। পরে দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল দুই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে। পুলিশের অভিযোগ, নীরজ ফরিদপুরিয়া ও হিমাংশুর দলের নির্দেশে হামলা হয়েছিল; অস্ত্র, টাকা এবং অন্যান্য ব্যবস্থাও তারাই করেছিল। এলভিশ তখন বাড়িতে ছিলেন না। তাঁর বাবা-মা উপস্থিত থাকলেও কেউ আহত হননি।

চলতি বছরের মার্চে মহারাষ্ট্র থেকে ভাউয়ের দলের দুই সন্দেহভাজন বন্দুকবাজকে ধরেছিল দিল্লি পুলিশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, লক্ষ্য ও নীরজ নামে ওই দু’জনের প্রত্যেকের সন্ধান দিতে এক লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। দিল্লিতে তোলাবাজিকে কেন্দ্র করে গুলিচালনা এবং হরিয়ানার একটি খুনের মামলায় তাদের খোঁজা হচ্ছিল। পুলিশের অভিযোগ ছিল, আমেরিকায় বসেই নির্দেশ পাঠাচ্ছিল ভাউ। ব্যবসায়ীদের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় এবং এলাকায় দলের দাপট প্রতিষ্ঠা করাই ছিল এ ধরনের হামলার অন্যতম উদ্দেশ্য।

গত সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ দিল্লির আয়ানগরে জিম প্রশিক্ষক বিজয় কুমারের হত্যাকাণ্ডেও ভাউয়ের নাম সামনে আসে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোটরবাইকে আসা দুই হামলাকারী তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। ভাউয়ের নামে সমাজমাধ্যমে একটি পোস্টে হত্যার দায় স্বীকার করা হয়েছিল। তবে পুলিশ জানিয়েছিল, পোস্টটির সত্যতা এবং হত্যার সঙ্গে তার যোগ যাচাই করা হচ্ছে। স্থানীয় পারিবারিক শত্রুতার সম্ভাবনাও তদন্তের আওতায় ছিল।

এখন ভারতীয় সংস্থাগুলির সামনে প্রধান কাজ হিমাংশু ও নীরজকে নিজেদের হেফাজতে আনা। প্রয়োজনীয় নথিপত্রের কাজ শেষ করতে উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের একটি বিশেষ দল আমেরিকা যেতে পারে বলে এক সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে। তবে গ্রেফতার হওয়া এবং ভারতে হস্তান্তর সম্পন্ন হওয়া পৃথক বিষয়। আইএএনএসের তথ্য অনুযায়ী, আপাতত দু’জন অভিবাসন-সংক্রান্ত হেফাজতে রয়েছে; দেশে ফেরার সময় নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার অগ্রগতির উপর।