বাংলাস্ফিয়ারঃ আদিবাসীদের চিকিৎসা করতে শহর ছেড়ে ওড়িশার প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাস শুরু করেছিলেন চিকিৎসক র‌্যান্ডাল সিকেইরা। চিকিৎসার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জমি, জল ও জঙ্গল রক্ষার আন্দোলনেও যুক্ত হন তিনি। সেই চিকিৎসক এখন খনিবিরোধী আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষের মামলায় রায়গড়ার জেলে। তাঁর গ্রেফতার নিয়ে চিকিৎসক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলির মধ্যে প্রতিবাদ উঠেছে।

গত ১৬ অক্টোবর রাত প্রায় ১১টায় কালাহান্ডির ভবানীপাটনায় সিকেইরার বাড়ি থেকে তাঁকে এবং দলিত অধিকারকর্মী লক্ষ্মণ নায়েককে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে তাঁদের রায়গড়া পুলিশের হাতে দেওয়া হয়। খুনের চেষ্টা, দাঙ্গা এবং অস্ত্র আইনের ধারাসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। দু’জনই বর্তমানে রায়গড়া সাবজেলে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩৯ বছরের সিকেইরার আদি বাড়ি কর্নাটকের মঙ্গলুরুতে। বড় হয়েছেন মুম্বইয়ে। বেঙ্গালুরুর সেন্ট জনস মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস এবং রাজস্থানের সওয়াই মান সিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে ইন্টারনাল মেডিসিনে এমডি করেন। ২০১৭ সালে কালাহান্ডিতে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে কাজ করলেও পরে স্বাধীনভাবে দুর্গম গ্রামে পৌঁছে চিকিৎসা করতেন। সহকর্মী চিকিৎসক দেওয়াল সাওয়ারকরের কথায়, গ্রামে গ্রামে শিবির করে গর্ভবতী মহিলা ও অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতেন তিনি। স্থানীয় মানুষ নিজেদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে শিখুন, সেটাই ছিল তাঁর কাজের লক্ষ্য।

পুলিশের দক্ষিণ-পশ্চিম রেঞ্জের আইজি অখিলেশ্বর সিংহের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতেই গ্রেফতার করা হয়েছে। সিকেইরার বিরুদ্ধে চার-পাঁচটি গুরুতর মামলা রয়েছে। রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করতে স্থানীয় মানুষকে প্ররোচিত করার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। দুই আদিবাসী মহিলা এ বিষয়ে অভিযোগ জানিয়েছেন বলে দাবি পুলিশের। এপ্রিল মাসে সিজিমালি বক্সাইট খনি এলাকায় সংযোগকারী রাস্তা নির্মাণ ঘিরে পুলিশ ও গ্রামবাসীর সংঘর্ষের সঙ্গে এই গ্রেফতার যুক্ত। সংশ্লিষ্ট এফআইআরে সিকেইরার নাম না থাকলেও তদন্তে তাঁর ভূমিকা পাওয়া গিয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

সিকেইরার সহকর্মীদের বক্তব্য, স্বাস্থ্যকে তিনি শুধু ওষুধ বা চিকিৎসকের পরামর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বিশুদ্ধ জল, পুষ্টিকর খাবার, জীবিকা এবং সুস্থ পরিবেশকে মানুষের সুস্বাস্থ্যের অপরিহার্য শর্ত মনে করতেন। খনির কারণে প্রাকৃতিক সম্পদ হারানোর আশঙ্কার সঙ্গে তাঁর জনস্বাস্থ্য ভাবনার যোগ ছিল। বন্ধু নীলেশ মোহিতের কথায়, আদিবাসী সমাজ, সংস্কৃতি ও জীবনযাপন বোঝার জন্য দীর্ঘ সময় দিয়েছেন তিনি। তাঁর মা ন্যান্সি সিকেইরাও জানিয়েছেন, ছেলে আদিবাসীদের অধিকার ও মর্যাদার জন্য কাজ করছে বলে তাঁর বিশ্বাস। এই কঠিন সময়ে ছেলের পাশে থাকার বার্তাও দিয়েছেন তিনি।

মেডিকো ফ্রেন্ড সার্কলের অভিযোগ, পুলিশ কোনও পরোয়ানা বা কারণ না জানিয়ে দু’জনকে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। পরিবারের সদস্য কিংবা আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি। ফোন বাজেয়াপ্ত করার নথিও দেওয়া হয়নি বলে দাবি সংগঠনটির। তাদের বক্তব্য, রাত থেকে আটক রাখা হলেও সরকারি নথিতে পরদিন সকালে গ্রেফতারের সময় দেখানো হয়েছে। এই অভিযোগগুলির স্বাধীন তদন্ত চেয়েছে তারা।

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে সিজিমালি ও কুট্রুমালি পাহাড়ে বক্সাইট উত্তোলনের প্রকল্প। মেডিকো ফ্রেন্ড সার্কলের বিবৃতি অনুযায়ী, সিজিমালির প্রকল্প বেদান্ত এবং কুট্রুমালির প্রকল্প আদানি গোষ্ঠীর মুন্দ্রা অ্যালুমিনিয়ামের সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের আশঙ্কা, খনির কাজ তাঁদের বন, কৃষিজমি, জলধারা ও জীবিকা বিপন্ন করবে। গ্রামসভার সম্মতি আদায়ের প্রক্রিয়া নিয়েও তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, পাহাড় তাঁদের কাছে জীবনধারণের ভিত্তি এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ।

সিকেইরা ও নায়েকের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি এবং গ্রেফতারের পদ্ধতি নিয়ে বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে মেডিকো ফ্রেন্ড সার্কল। তাদের মতে, প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানো স্বাস্থ্যকর্মীদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হলে চিকিৎসা ও অধিকাররক্ষার কাজ বাধাগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে পুলিশ এই পদক্ষেপকে অপরাধের তদন্তের অংশ বলেই বর্ণনা করছে। সিকেইরার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে এখনও প্রমাণিত হয়নি।