বাংলাস্ফিয়ার: যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ ঠেকাতে শনিবার রাজধানীর বিভিন্ন অংশে কড়াকড়ির পাশাপাশি আটটি অস্থায়ী আটককেন্দ্রের আশপাশেও মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশে ১০ অক্টোবর দুপুর ১২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়। প্রতিটি কেন্দ্রের চারদিকে ৫০০ মিটার ব্যাসার্ধের এলাকা এর আওতায় ছিল।
দিল্লি পুলিশ একাধিক স্টেডিয়াম, ক্রীড়া কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি সেন্টারকে সাময়িক আটককেন্দ্রে পরিণত করেছিল। বিভিন্ন জায়গা থেকে আটক বিক্ষোভকারীদের সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ৯ অক্টোবরের নির্দেশে জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অপরাধে প্ররোচনা ঠেকানোর যুক্তি দেওয়া হয়। নির্দেশটি জারি করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব; কার্যকর করার দায়িত্ব দেওয়া হয় দিল্লির পুলিশ কমিশনারকে।
তালিকায় ছিল মডেল টাউনের ছত্রশাল স্টেডিয়াম, বাওয়ানার রাজীব গান্ধী স্টেডিয়াম, যমুনা স্পোর্টস কমপ্লেক্স, জসোলা স্পোর্টস কমপ্লেক্স, দৌলতপুর ও পান্ডওয়ালা খুর্দের কমিউনিটি সেন্টার, নিজামপুর–কাঞ্ঝাওয়ালা এলাকার জংলি রাম স্টেডিয়াম এবং নাংলোইয়ের সুরজমল স্টেডিয়াম। নির্দিষ্ট এলাকায় সব ধরনের মোবাইল ইন্টারনেট প্রযুক্তির পরিষেবা স্থগিত রাখার কথা বলা হয়েছিল। নির্দেশে ২০২৩ সালের টেলিযোগাযোগ আইন এবং ২০২৪ সালের সাময়িক পরিষেবা স্থগিত রাখার বিধির উল্লেখ রয়েছে।
পূর্ব দিল্লির বাসিন্দারাও সামাজিক মাধ্যমে ইন্টারনেটের সমস্যার কথা জানান। তাঁদের প্রশ্ন ছিল, তাঁদের এলাকাতেও কি নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে?
বিক্ষোভের মূল দাবি ছিল মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে কর্মসূচি ডেকেছিল ককরোচ জনতা পার্টি এবং ছাত্রসংগঠনগুলি। নির্বাচন কমিশন অবশ্য অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। শনিবারের ধরপাকড়ে রাজনৈতিক নেতা ছাড়াও ছাত্র, আইনজীবী, সাংবাদিক এবং সাধারণ নাগরিকেরা আটক হন। ফলে বিক্ষোভস্থলের বাইরে ছড়িয়ে থাকা আটককেন্দ্রগুলিও দিনের ঘটনাপ্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
পুলিশ আগেই সমাবেশের অনুমতি প্রত্যাখ্যান করেছিল। তাদের বক্তব্য ছিল, আয়োজকদের আবেদন নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে জমা পড়েছে। যন্তর মন্তরে কর্মসূচির জন্য অন্তত দশ দিন আগে আবেদন করার নিয়ম থাকলেও আবেদন আসে ৭ অক্টোবর। অতীতের কর্মসূচিতে নির্দেশ না মানা, জননিরাপত্তা এবং যান চলাচলের কথাও উল্লেখ করে পুলিশ। পাশাপাশি মেট্রো স্টেশনে প্রবেশ ও প্রস্থানে বিধিনিষেধ এবং রেল পরিষেবায় কাটছাঁটের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ইন্টারনেট বন্ধের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ারও গুরুত্ব রয়েছে। ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের বিধিতে পরিষেবা স্থগিতের নির্দেশ প্রকাশ করা, কারণ জানানো এবং কোন এলাকায় কোন পরিষেবা কত সময় বন্ধ থাকবে, তা স্পষ্ট করার কথা বলা হয়েছে। অন্য যুক্তিসঙ্গত উপায়ে উদ্দেশ্য পূরণ সম্ভব কি না, সেটিও কর্তৃপক্ষকে বিবেচনা করতে হয়। অর্থাৎ জনশৃঙ্খলার কথা বলার পাশাপাশি নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করাও এই ব্যবস্থার অংশ। বিধিতে নির্দেশের মেয়াদ সর্বোচ্চ পনেরো দিন নির্ধারিত রয়েছে। পর্যালোচনা কমিটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত খতিয়ে দেখার ব্যবস্থাও আছে। তবে শনিবারের নির্দেশে এই আটটি এলাকার জন্য দশ ঘণ্টার নির্দিষ্ট সময়সীমাই বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, অনির্দিষ্টকালের নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হয়নি।
আটককেন্দ্রের বাইরে পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞার বিস্তার ঘটনাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। মোবাইল ডেটা বন্ধ হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের অনলাইন বার্তা পাঠানো, তথ্য খোঁজা কিংবা ইন্টারনেটনির্ভর পরিষেবা ব্যবহারে বাধা তৈরি হতে পারে। তবে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধের অর্থ সব ধরনের ফোনকলও বন্ধ—এমন সিদ্ধান্ত এই নির্দেশ থেকে করা যায় না। এখানে প্রকাশিত তথ্য মূলত মোবাইল ডেটা পরিষেবা স্থগিত রাখার বিষয়েই।
এই ঘটনার তাৎপর্য তাই শুধু কোথায় বিক্ষোভ হল বা কোথা থেকে মানুষকে আটক করা হল, তার মধ্যে সীমিত নয়। যাঁদের সরিয়ে অন্যত্র রাখা হয়েছিল, সেই জায়গাগুলির চারপাশেও যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। নিরাপত্তার প্রয়োজনে নেওয়া ব্যবস্থার পরিধি এবং নাগরিকদের দৈনন্দিন যোগাযোগের প্রয়োজন—দুইয়ের সম্পর্কই এতে সামনে এসেছে।