বাংলাস্ফিয়ার: ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে বিরোধীদের আন্দোলনের মুখে রাহুল গান্ধীকে আক্রমণ করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর তাঁর অভিযোগ, অনুপ্রবেশকারীদের নাম ভোটার তালিকায় রেখে নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক রক্ষার চেষ্টা করছে কংগ্রেস। রাহুলের এই উদ্দেশ্য দেশবাসী বুঝতে পারছেন এবং তাঁরা বিভ্রান্ত হবেন না বলে দাবি করেন শাহ।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং এসআইআর বাতিলের দাবিতে চলা আন্দোলন সম্পর্কে শাহ বলেন, নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। তাঁর যুক্তি, ভোটার হওয়ার জন্য ভারতীয় নাগরিকত্ব ও নির্ধারিত বয়সের শর্ত পূরণ করতে হয়। সেই যোগ্যতা যাচাই করতেই কমিশন প্রশ্ন করবে। প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি থাকলে আদালতে যাওয়ার কথাও বলেন তিনি।
কংগ্রেসের নির্বাচনী ব্যর্থতার জন্য এসআইআর নয়, রাহুলের নেতৃত্বকেই দায়ী করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার বহু আগে থেকেই বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেসের পরাজয় ঘটছে। গুজরাত, ত্রিপুরা, তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গের উদাহরণ তুলে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকতে নির্বাচন কমিশনকে নিশানা করা হচ্ছে। রাহুলকে আত্মসমীক্ষার পরামর্শও দেন তিনি।
২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন নিয়েও আগাম জয়ের দাবি করেন শাহ। তাঁর বক্তব্য, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে এবং কংগ্রেসকে টানা চতুর্থ পরাজয়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচন ও উপনির্বাচনে বিজেপি এবং সহযোগীদের সাফল্যকে তিনি নরেন্দ্র মোদীর প্রতি জনসমর্থনের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন।
দিল্লিতে বিরোধীদের মিছিলের গুরুত্বও খাটো করেন শাহ। তাঁর দাবি, চোদ্দোটি দলের কর্মী মিলিয়ে দেড় কিলোমিটার এলাকায় প্রায় আট হাজার মানুষের জমায়েত করলেই দেশের কণ্ঠস্বর হওয়া যায় না। সাজানো প্রচারানুষ্ঠান এবং নেতিবাচক রাজনীতির বদলে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে বলেন তিনি। কিছু স্থানীয় নির্বাচনে ব্যালট পেপার ব্যবহারের কথাও মনে করিয়ে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
একই দিনে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল প্রশ্ন তোলেন, ভোটচুরির প্রমাণ থাকলে বিরোধীরা সুপ্রিম কোর্টে তা পেশ করছেন না কেন। বিরোধীদের আবেদনে আদালতের রেজিস্ট্রি চোদ্দোটি ত্রুটি চিহ্নিত করায় কংগ্রেসকে কটাক্ষ করেন তিনি। কংগ্রেসের বক্তব্য, এগুলি প্রক্রিয়াগত ত্রুটি এবং সংশোধনের কাজ চলছে।
বিরোধী শিবির অবশ্য আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অবস্থানেই অনড়। নিজের বাসভবনে ইন্ডিয়া জোটের নেতা, সাংসদ এবং ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পরে রাহুল বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রতিরোধ চলবে। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে দুর্বল করা হচ্ছে এবং ভোটার তালিকার সংশোধনে অনিয়ম ঘটছে।
রাহুলের বক্তব্য, আদালত ও বিচারব্যবস্থার প্রতি তাঁদের শ্রদ্ধা রয়েছে। তবে কোনও প্রতিষ্ঠান কী ভূমিকা নেবে, তার অপেক্ষায় রাজনৈতিক আন্দোলন থেমে থাকবে না। জন্তর মন্তরে প্রতিবাদের সুযোগ সীমিত করার বিরুদ্ধেও সরব হন তিনি। নাগরিকদের গণতান্ত্রিক বিরোধিতা প্রকাশের অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখার দাবি জানান লোকসভার বিরোধী দলনেতা। আন্দোলনের পরবর্তী পদক্ষেপ অবশ্য বিস্তারিত জানাননি রাহুল। তাঁর বক্তব্য, লক্ষ্যপূরণে কয়েক মাস কিংবা আরও বেশি সময় লাগলেও বিরোধীরা পিছিয়ে যাবে না। সাম্প্রতিক কর্মসূচিতে তৈরি ঐক্য ও উদ্যম ধরে রাখার কথাও বলেন তিনি।
শাহের নির্বাচনী ভবিষ্যদ্বাণীর পাল্টা জবাব দেন কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশও। তাঁর অভিযোগ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই আত্মবিশ্বাসের পিছনে রয়েছে নির্বাচনী কারচুপির পরিকল্পনা। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে দাবি করেন, বিরোধীদের সাম্প্রতিক কর্মসূচিতে বিপুল জনসমর্থন মিলেছে। তরুণদের অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন দলের ঐক্যকে আন্দোলনের শক্তি হিসেবে তুলে ধরে বিরোধীরা জানিয়েছে, ভোটের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা চলবে।
ফলে এসআইআর ঘিরে সংঘাত এখন ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতি ছাড়িয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রতিবাদের অধিকারকে কেন্দ্র করে তীব্র হচ্ছে। বিজেপির বক্তব্যে প্রাধান্য পাচ্ছে অনুপ্রবেশ ও ভোটব্যাঙ্কের অভিযোগ; বিরোধীদের বক্তব্যে ভোটাধিকার এবং নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহির দাবি।