বাংলাস্ফিয়ারঃ নিট-ইউজি ২০২৬-এর প্রশ্নফাঁসের তদন্তে সামনে এল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। মহারাষ্ট্রের লাতুরে আরসিসি ক্লাসেসের প্রতিষ্ঠাতা শিবরাজ মোটেগাঁওকরের মোবাইল থেকে উদ্ধার হওয়া নথির সঙ্গে রসায়নের একটি মূল প্রশ্নসেটের সব ক’টি প্রশ্ন মিলে গিয়েছে বলে দাবি করেছে সিবিআই। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষার ভিত্তিতে অতিরিক্ত চার্জশিটে এই তথ্য জানিয়েছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। প্রশ্নগুলি পরীক্ষার আগে কীভাবে ছড়িয়েছিল, সেই সূত্রও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘শিবালিক’ নামের মাস্টার টেস্ট বুকলেটের রসায়নের ৪৫টি প্রশ্নই উদ্ধার হওয়া নথির সঙ্গে মিলেছে। ‘কৈলাস’ সেটের ক্ষেত্রে মিলেছে ৪৩টি এবং অন্য একটি সেটের ৪০টি প্রশ্ন। চতুর্থ সেটের মাত্র একটি প্রশ্নের মিল পাওয়া গিয়েছে। তদন্তসূত্রের বক্তব্য, ধৃত শিক্ষক পি ভি কুলকার্নি ওই চতুর্থ সেটটি দেখার সুযোগ পাননি, কারণ সেটির পুনরনুবাদ হয়নি।

এনটিএ তদন্তকারীদের জানিয়েছে, নিটের জন্য চারটি মূল প্রশ্নসেট তৈরি হয়। প্রতিটিতে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, উদ্ভিদবিদ্যা ও প্রাণিবিদ্যার ৪৫টি করে মোট ১৮০টি প্রশ্ন থাকে। এর মধ্যে পরীক্ষাকেন্দ্রে পাঠানোর জন্য নির্ধারিত ছিল ‘কৈলাস’ ও ‘শিবালিক’। বাকি দু’টি সাধারণভাবে পরীক্ষার্থীদের দেওয়ার জন্য নির্ধারিত ছিল না। ফলে কোন সেটের প্রশ্ন কার নাগালে ছিল, তা তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

আরসিসির মক টেস্টও পরীক্ষা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ১৯ এপ্রিলের পরীক্ষায় ‘কৈলাস’ সেটের সঙ্গে ১৫টি প্রশ্নের মিল পাওয়া গিয়েছে। ৩০ এপ্রিলের মক টেস্টে ‘শিবালিক’-এর ছ’টি এবং অন্য একটি সেটের পাঁচটি প্রশ্নের মিল মেলে। কুলকার্নির ফোনে পাওয়া ১২টি ছবিতে থাকা রসায়নের ১৩টি প্রশ্নও মূল সেটগুলির প্রশ্নের সঙ্গে মিলেছে বলে তদন্তসূত্রে দাবি করা হয়েছে।

গত ২৮ জুলাই দিল্লির ফাস্ট ট্র্যাক আদালতে দেওয়া চার্জশিটে ১৩ জনকে অভিযুক্ত করা হয়; পরে ফরেনসিক রিপোর্ট-সহ অতিরিক্ত চার্জশিটও জমা দিয়েছে কেন্দ্রীয় সিবিআই।

প্রশ্নের মিল যাচাইয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল যোগাযোগের সূত্র ধরে এগিয়েছে তদন্ত। সিবিআইয়ের অভিযোগ, পরীক্ষার আগেই হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ও এয়ারড্রপের মাধ্যমে প্রশ্নসংক্রান্ত নথি আদানপ্রদান হয়েছিল। কার কাছ থেকে কার কাছে প্রশ্ন পৌঁছেছিল, তা বোঝার জন্য উদ্ধার হওয়া ফাইল, হাতে লেখা নোট, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং টাকা দেওয়ার বিষয়ে বার্তা পরীক্ষা করেছেন তদন্তকারীরা।

মোটেগাঁওকরকে ঘিরে তদন্ত অবশ্য শুরু হয়েছিল কয়েক মাস আগেই। মে মাসে তাঁর গ্রেফতারির সময় সিবিআই অভিযোগ করেছিল, তিনি পরীক্ষার আগে প্রশ্ন ও উত্তর সংগ্রহ করে অন্যদের দিয়েছিলেন। ১৪ মে লাতুরের বাড়িতে তল্লাশির সময় তাঁর ফোনে প্রশ্নসংক্রান্ত নথি পাওয়ার দাবি করে সংস্থা। ফোনটি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য বাজেয়াপ্ত করা হয়। পরীক্ষার পরে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র নষ্ট করার অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল।

মহারাষ্ট্রের কোচিং জগতে পরিচিত মুখ মোটেগাঁওকর। কৃষক পরিবার থেকে উঠে আসা এই রসায়ন শিক্ষক প্রথম জীবনে সাইকেলে ঘুরে পড়াতেন। প্রায় ১৯৯৯ সালে লাতুরে ভাড়ার জায়গায় মাত্র দশজন পড়ুয়াকে নিয়ে নিজস্ব কোচিং শুরু করেন। পরে তাঁর প্রতিষ্ঠান রাজ্যের একাধিক শহরে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রেফতারির আগে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিয়োয় তাঁকে পড়ুয়াদের কাছে জানতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের মক টেস্টের কত প্রশ্ন আসল নিটে এসেছে।

চলতি বছরের ৩ মে নিট-ইউজি পরীক্ষা হয়েছিল। প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের পরে ১২ মে পরীক্ষা বাতিল করে এনটিএ। নতুন করে পরীক্ষা হয় ২১ জুন; ফল প্রকাশিত হয় ১৬ জুলাই। সেই ঘটনাপ্রবাহের পরে ফোনে উদ্ধার হওয়া প্রশ্নের বিশেষজ্ঞ-পরীক্ষা প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা এবং পরীক্ষা পরিচালনার নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ককে ফের সামনে এনেছে।

তবে তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ ও আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া পৃথক বিষয়। উদ্ধার হওয়া নথি, তার আদানপ্রদানের সময় এবং প্রত্যেক অভিযুক্তের নির্দিষ্ট ভূমিকা বিচারপর্বে যাচাই হবে। এই অনুসন্ধানের তাৎপর্য এখানেই: প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের পাশাপাশি এখন প্রশ্ন তৈরির ব্যবস্থা থেকে কোচিং ও পরীক্ষার্থীদের কাছে তথ্য পৌঁছনোর সম্ভাব্য পথও এই তদন্তের অংশ।