রোগ ধরা পড়ার প্রায় দশ বছর আগেই রক্তে মিলতে পারে অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগের (আইবিডি) সংকেত। অ্যান্টিবডির ধরন বিশ্লেষণ করে ক্রোন্স রোগ ও আলসারেটিভ কোলাইটিসের পূর্বাভাস পাওয়ার সম্ভাবনা দেখাল নতুন গবেষণা। তবে এই পদ্ধতি এখনও পরীক্ষামূলক, রোগ নির্ণয়ে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত নয়।
রোগের উপসর্গ দেখা দেওয়ার অনেক আগেই কি শরীরের রক্তে লুকিয়ে থাকে তার আগাম সংকেত? অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ বা ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ (আইবিডি) নিয়ে নতুন এক গবেষণা সেই সম্ভাবনাই তুলে ধরেছে। গবেষকদের দাবি, রক্তে থাকা অ্যান্টিবডির ধরন বিশ্লেষণ করে রোগ নির্ণয়ের প্রায় এক দশক আগেই এই অসুখের পূর্বাভাস পাওয়ার ইঙ্গিত মিলতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে রোগটি আরও আগে শনাক্ত করা, এমনকি প্রতিরোধের পথ খোঁজারও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
আইবিডির প্রধান দুটি ধরন হল ক্রোন্স রোগ ও আলসারেটিভ কোলাইটিস। সাধারণত উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরেই এই রোগগুলির চিকিৎসা শুরু হয়। তত দিনে অন্ত্রে প্রদাহ ও ক্ষতি অনেকটাই এগিয়ে যেতে পারে। কিন্তু গবেষকদের পর্যবেক্ষণ, রোগ নির্ণয়ের বহু বছর আগেই শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
নেদারল্যান্ডসের ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল সেন্টার গ্রোনিঙ্গেন এবং নিউ ইয়র্কের মাউন্ট সিনাইয়ের আইকান স্কুল অব মেডিসিনের গবেষক ডা. আর্নো বুর্গোনিয়ে বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে আমরা অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগের চিকিৎসা শুরু করতে পেরেছি কেবল ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পরে। বহু মানুষের ক্ষেত্রে তখন অনেক দেরি হয়ে যায়।”
তাঁর কথায়, “আমরা দেখিয়েছি, উপসর্গ প্রকাশের বহু বছর আগেই রোগটি শুরু হয়। রোগ নির্ণয়ের অনেক আগে থেকেই রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সতর্কতার চিহ্ন রেখে যায়। এটি এখনও এমন কোনও পরীক্ষা নয়, যা দিয়ে কাউকে বলে দেওয়া যাবে যে তিনি অসুস্থ হবেন। তবে আরও আগে রোগটি শনাক্ত করার এবং একদিন তা প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।”
কেন আগাম শনাক্তকরণ জরুরি?
বিশ্বজুড়ে অন্তত ৩৮ লক্ষ মানুষ আইবিডি নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন। রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত এই অসুখে পরিপাকতন্ত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি হয়। এর ফলে পেটে ব্যথা, ডায়রিয়া ও ক্লান্তির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
রোগটির সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও জানা যায়নি। তবে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, বংশগত বৈশিষ্ট্য এবং অন্ত্রে বসবাসকারী অণুজীব—সবকটিই এর বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে।
চিকিৎসায় মূলত প্রদাহ কমানো এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার অতিসক্রিয়তা নিয়ন্ত্রণের ওষুধ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সব রোগী তাতে সমান ভাবে সাড়া দেন না। অনেকের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচার করে অন্ত্রের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ বাদ দিতে হয়। দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহে অন্ত্রের ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই অন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতি শুরু হওয়ার আগেই রোগের সংকেত খুঁজে বের করা চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম লক্ষ্য।
রক্তের নমুনায় কী মিলল?
বুর্গোনিয়ে এবং মাউন্ট সিনাই ও মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনার তাঁর সহকর্মীরা মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যদের কাছ থেকে সংগৃহীত রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ করেন। মোট ৫০০ জনের ২,০০০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। তাঁদের মধ্যে ২০০ জন পরে ক্রোন্স রোগে এবং আরও ২০০ জন আলসারেটিভ কোলাইটিসে আক্রান্ত হন। বাকি ১০০ জনের কোনও রোগই ধরা পড়েনি।
গবেষকেরা রক্তে এমন অ্যান্টিবডির খোঁজ করেন, যা ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, খাদ্য কিংবা শরীরের নিজস্ব কলা থেকে আসা বিভিন্ন প্রোটিনখণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় তৈরি হয়। এই অ্যান্টিবডিগুলির ধরন বিশ্লেষণ করে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়ার মধ্যে কোনও আগাম পার্থক্য রয়েছে কি না, তা বোঝার চেষ্টা করেন তাঁরা।
ক্রোন্স রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এপস্টাইন–বার ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডির মাত্রা বেশি দেখা যায়। এই ভাইরাস সংক্রামক মনোনিউক্লিওসিস বা গ্ল্যান্ডুলার ফিভারের মতো অসুখের কারণ হতে পারে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, রোগ নির্ণয়ের প্রায় এক দশক আগেও এই পার্থক্য দেখা গিয়েছিল।
যাঁদের পরে ক্রোন্স রোগ আরও গুরুতর ও জটিল আকার নেয়, তাঁদের ক্ষেত্রে এই সংকেত ছিল সবচেয়ে জোরালো। রোগটির জটিলতায় অন্ত্র সরু হয়ে যেতে পারে কিংবা অন্ত্রের বিভিন্ন অংশের মধ্যে অথবা অন্ত্র ও অন্য অঙ্গের মধ্যে অস্বাভাবিক সংযোগপথ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, আলসারেটিভ কোলাইটিসে আক্রান্তদের অ্যান্টিবডির ধরন ছিল আলাদা। তাঁদের রক্তে শরীরের নিজস্ব একটি প্রোটিনের বিরুদ্ধে তৈরি অ্যান্টিবডিও পাওয়া যায়। অর্থাৎ, দুই ধরনের আইবিডির ক্ষেত্রে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার আগাম প্রতিক্রিয়া এক রকম নাও হতে পারে।
আশা রয়েছে, তবে সতর্কতাও জরুরি
গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে ‘গাট’ পত্রিকায়। বার্সেলোনায় ইউনাইটেড ইউরোপিয়ান গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজির সম্মেলনেও তা উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে গবেষণার ফল অন্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরীক্ষা করে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এই গবেষণায় অ্যান্টিবডির ধরন ও পরবর্তী রোগ নির্ণয়ের মধ্যে যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এপস্টাইন–বার ভাইরাসের সংক্রমণই যে আইবিডির কারণ, তা প্রমাণিত হয়নি।
তবু গবেষকেরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এই পদ্ধতি আরও উন্নত হলে আইবিডির ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা সহজ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে টাইপ ১ ডায়াবেটিসের উদাহরণ সামনে আসছে। এই রোগে উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই রক্ত পরীক্ষায় এমন কিছু অ্যান্টিবডি শনাক্ত করা সম্ভব, যা থেকে বোঝা যায় রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা অগ্ন্যাশয়ের কোষগুলিকে আক্রমণ করতে শুরু করেছে। কিছু ক্ষেত্রে এর ভিত্তিতে এমন চিকিৎসা দেওয়া যায়, যা রোগের প্রকাশ পিছিয়ে দিতে পারে।
গবেষণাটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না বার্টস হেলথের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজির অধ্যাপক জেমস লিন্ডসে। তাঁর মতে, এই গবেষণা “ক্রোন্স রোগ ও আলসারেটিভ কোলাইটিসের কারণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিয়েছে। আইবিডির ঝুঁকিতে কারা রয়েছেন, তা চিহ্নিত করার জন্য সম্ভাব্য নতুন উপায়ও এর মাধ্যমে পাওয়া যেতে পারে।”
তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, এই পদ্ধতিগুলি এখনও গবেষণার পর্যায়েই রয়েছে। রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য সেগুলি প্রস্তুত নয়।
ব্রিটেনের জাতীয় দাতব্য সংস্থা ক্রোন্স অ্যান্ড কোলাইটিস ইউকে-র প্রধান নির্বাহী মারিয়ান র্যাডক্লিফও গবেষণাটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। তাঁর কথায়, “ক্রোন্স ও কোলাইটিসে আক্রান্ত মানুষদের জন্য এ ধরনের গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। প্রতিটি নতুন উপলব্ধি এই রোগগুলি কীভাবে তৈরি হয়, তা আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে সাহায্য করে। উপসর্গ দেখা দেওয়ার বহু বছর আগে শরীরে কী কী পরিবর্তন ঘটতে পারে, সেই বিষয়টিও এর অন্তর্ভুক্ত।”
রক্তে অ্যান্টিবডির এই আগাম সংকেত ভবিষ্যতে কতটা নির্ভরযোগ্য পরীক্ষায় পরিণত হয়, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবে নতুন এই আবিষ্কার অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—উপসর্গ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা না করে, শরীরের আগাম সংকেত থেকেই কি একদিন রোগের মোকাবিলা করা সম্ভব হবে?