হৃৎপিণ্ডে রক্ত সরবরাহকারী প্রধান ধমনিতে রক্ত জমাট বেঁধেই হার্ট অ্যাটাক। অভিনেতা নানা পাটেকরের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে এমনই তথ্য উঠে এল ময়নাতদন্তের রিপোর্টে। করোনারি ধমনির রোগের জেরে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে তীব্র হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৭৫ বছর বয়সি অভিনেতা। রবিবার, ১১ অক্টোবর, গোয়া মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের এক প্রবীণ চিকিৎসক এই তথ্য জানিয়েছেন। রিপোর্টে তাঁর মৃত্যুকে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গত ৮ অক্টোবর ভোরে গোয়ার পানাজির কাছে দোনা পাওলার বাড়ি থেকে নানা পাটেকরকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে কার্ডিয়োপালমোনারি রিসাসিটেশন বা সিপিআর দিয়েও তাঁকে বাঁচাতে পারেননি। সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোর ৫টা ১০ মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। প্রাথমিক ভাবে চিকিৎসকদের অনুমান ছিল, হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়েই মৃত্যু হয়েছে অভিনেতার। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে মিলল তার নির্দিষ্ট কারণ।

রিপোর্ট অনুযায়ী, করোনারি ধমনির অ্যাথেরোস্ক্লেরোটিক রোগের কারণে বাঁ দিকের প্রধান করোনারি ধমনিতে রক্ত জমাট বেঁধেছিল। এর জেরেই ঘটে তীব্র মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন, অর্থাৎ হার্ট অ্যাটাক। হৃৎপিণ্ডের একটি বড় অংশে রক্ত পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব এই ধমনির। সেখানে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হৃৎপিণ্ডের পেশিতে অক্সিজেনের সরবরাহ ব্যাহত হয়। চিকিৎসকদের মতে, এই ঘটনাই অভিনেতার মৃত্যুর কারণ।

অভিনেতা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বুঝতে পেরে তাঁর দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি হাসপাতালে গিয়ে অ্যাম্বুল্যান্স চান। হাসপাতাল থেকে তাঁর বাড়ির দূরত্ব ছিল এক কিলোমিটারেরও কম। খবর পেয়েই দ্রুত অ্যাম্বুল্যান্স পাঠানো হয়। মণিপাল হাসপাতালের চিকিৎসক শেখর সালকারের বক্তব্য অনুযায়ী, চিকিৎসকেরা বাড়িতে পৌঁছে অভিনেতাকে সাড়াহীন অবস্থায় দেখতে পান। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় সিপিআর। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেও চলে সেই চেষ্টা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত পুলিশি বিবরণ অনুযায়ী, গভীর রাতে অসুস্থ বোধ করার কথা জানিয়ে পরিচিত অমেয় নায়েককে বার্তা পাঠিয়েছিলেন পাটেকর। পরে নায়েক তাঁর বাড়িতে পৌঁছে অভিনেতাকে অচেতন অবস্থায় দেখতে পান। নিরাপত্তারক্ষীর সাহায্যে দ্রুত জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। তবে হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই তাঁর শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি হয়েছিল বলে চিকিৎসকদের বিবরণে উঠে এসেছে।

হাসপাতালে মৃত অবস্থায় আনার ঘটনায় নিয়মমাফিক মৃত্যুর কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করে গোয়া পুলিশ। এক প্রবীণ পুলিশকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই অস্বাভাবিক মৃত্যুর নথি তৈরি করা হয়েছিল। তবে পুলিশের প্রাথমিক নথিভুক্তি এবং ময়নাতদন্তের চিকিৎসাগত সিদ্ধান্ত এক বিষয় নয়। ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ হিসেবে স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে তীব্র হৃদ্‌রোগের কথা।

ময়নাতদন্তের পর অভিনেতার দেহ গোয়া থেকে পুণেতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে দেহ পৌঁছয় ডোঞ্জে গ্রামের খামারবাড়িতে। বৃহস্পতিবার রাতেই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। ছেলে মলহার পাটেকর মুখাগ্নি করেন। শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত ছিলেন অভিনেতা জ্যাকি শ্রফ, মকরন্দ আনাসপুরে-সহ চলচ্চিত্রজগতের বহু পরিচিত মুখ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রের প্রতিনিধিরা।

প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে হিন্দি ও মরাঠি চলচ্চিত্রে নিজস্ব ঘরানা তৈরি করেছিলেন নানা পাটেকর। ১৯৭৮ সালের ‘গমন’ দিয়ে তাঁর চলচ্চিত্রযাত্রা শুরু। পরে ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’ এবং মীরা নায়ারের ‘সালাম বম্বে!’-র মতো ছবিতে অভিনয় করে দর্শকের মনে জায়গা করে নেন তিনি। জটিল চরিত্রে তীব্রতা, সংলাপে দৃঢ়তা এবং অভিনয়ে সংবেদনশীলতার মিশেল ছিল তাঁর বিশেষত্ব। অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছিলেন তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং পদ্মশ্রী সম্মান।

মরাঠি নাট্যমঞ্চ থেকে উঠে আসা এই অভিনেতা শুধু গম্ভীর চরিত্রেই নয়, হাস্যরসাত্মক ভূমিকাতেও দর্শকের মন জয় করেছিলেন। তাঁর স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর, সংলাপ বলার ধরন এবং পর্দায় উপস্থিতি তাঁকে সমসাময়িক অভিনেতাদের থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল। সহকর্মী অক্ষয় কুমারও স্মরণ করেছেন তাঁর অভিনয়ের সেই নিজস্বতা।

মৃত্যুর পর প্রাথমিক ভাবে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা সামনে এলেও, ঠিক কী কারণে এমনটা ঘটেছিল, তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা ছিল না। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে এবার সেই প্রশ্নের উত্তর মিলল—করোনারি ধমনিতে রক্ত জমাট বেঁধে হওয়া তীব্র হার্ট অ্যাটাকই কেড়ে নিল নানা পাটেকরের প্রাণ।